* ডানপন্থি রাজনীতির দিকে ঝুঁকে পড়েছে: জোবাইদা নাসরীন
* এনসিপি ছাড়ার কারণ জামায়াত ইস্যু: মীর আরশাদুল হক
* ডানপন্থার দিকে ঝুঁকে যাওয়ার সুযোগ নেই: সারজিস আলম
জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা সরকারকে উৎখাতে বাধ্য করে জাতির আস্থায় আসা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার হাতে গড়া জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) বিতর্ক যেন পিছু ছাড়ছে না-এমনই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকসহ রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিশিষ্টজনরা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে, গত বছর (২০২৫ সালের) ২৮ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করার কয়েক মাসের মধ্যই এই দলটির বেশ কিছু নেতাকর্মী চাঁদাবাজি ও দখলবাজিসহ নারী কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়ে। এসব কারণে দল থেকে বেশ কিছু নেতাকর্মীকে বহিষ্কার করা হয়। দেশব্যাপী ছাত্রসংগঠনের কমিটিকে ভেঙে দেওয়া হয়। বড় ধরনের সমালোচনার মুখে পড়ে দলটি।
বিশিষ্টজনরা বলছে, মধ্যপন্থি এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী দাবি করা এই দলটির লক্ষ্য ছিল একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বৈষম্যহীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠন করা। কিন্তু তারা ফের বিতর্কের মুখে পড়ে স্বাধীনতা বিরোধী দল জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনি জোট গঠন করে। জামায়াতের সঙ্গে জোটে যাওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে প্রথম সপ্তাহের মধ্যেই এনসিপির অন্তত ১৩ থেকে ১৫ জন কেন্দ্রীয় নেতা পদত্যাগ করেন। পরবর্তীতে, রাঙ্গামাটি জেলা কমিটির ৭ জন শীর্ষ নেতা দল ছাড়েন। এমনকি এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব তাসনিম জারাসহ বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা জামায়াত জোটের বিরোধিতা করে পদত্যাগ করেন। এছাড়া, দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে ৩০ জন কেন্দ্রীয় নেতা চিঠি দিয়ে এই জোটের তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন এবং দলের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। সেই সময় পদত্যাগকারীরা অভিযোগ করেন, এনসিপি তার স্বতন্ত্র অবস্থান হারিয়ে ডানপন্থি ঘরানায় ঢুকে পড়ছে। কাজেই, দলটির রহস্যময় রাজনৈতিক অবস্থান প্রসঙ্গে সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। কেন বারবার বিতর্কের মুখে পড়ছে এই দলটি? কোন পথে এগুচ্ছে এনসিপি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এনসিপির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো তাদের আদর্শিক অস্পষ্টতা। কোনো সময় তারা ক্ষমতাসীন দলের ঘনিষ্ঠ হতে চায়, আবার কখনো বিরোধী জোটের সাথে সখ্য গড়ে তোলে। এই ‘দ্বিমুখী’ অবস্থান রাজনৈতিক মহলে তাদের গ্রহণযোগ্যতা কমিয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে গত জাতীয় নির্বাচনের আগে জোট গঠন নিয়ে দলটির যে গড়িমসি ছিল, তা এখনো রাজনৈতিক অঙ্গনে চর্চার বিষয় হিসেবে রয়ে গেছে বলে উল্লেখ করছেন বিশিষ্টজনরা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত, আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ও নিবন্ধন দ্রুত বাতিলের দাবি করা দল এনসিপি এখন স্ববিরোধী কথা বলছেন। আওয়ামী লীগের নির্দোষ নেতাকর্মীদের এনসিপিতে আসার আহবান জানিয়েছেন দলটির শীর্ষ নেতারা। তবে এ আহবানে বিব্রত সাধারণ কর্মী-সমর্থকরা।
এদিকে, সাম্প্রতিককালে বিভিন্ন দল থেকে অনেককেই যুক্ত হতে দেখা যাচ্ছে এনসিপিতে। কেউ এসেছেন বিএনপি থেকে, কেউ জাতীয় পার্টি, আবার জামায়াত ঘরানার সংগঠন থেকেও কেউ কেউ ঘটা করে যোগ দিয়েছেন এনসিপিতে। গত এক মাসেরও বেশি সময় ধরে ঢাকা তো বটেই, ঢাকার বাইরেও রীতিমতো আয়োজন করে এসব ‘যোগদান অনুষ্ঠান’ করেছে এনসিপি। যদিও ভিন্ন ভিন্ন দল থেকে লোক যুক্ত করলে সেটা আদর্শিকভাবে দলটিকে টানাপড়েনের মধ্যে ফেলতে পারে এমন আশঙ্কাও করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
বিশিষ্টজনরা বলছে, আওয়ামী লীগ সরকার যখন জামায়াত ইসলামীর কার্যক্রম ও দল নিষিদ্ধ করেছিল, তখন বি-টিম হিসেবে ‘আমার বাংলাদেশ পার্টি’ নামক গঠন করেছিল। এবি পার্টি বি-টিম হিসেবে জামায়াতের প্রত্যাশামতো কাজ না করতে পারায়, বি-টিম হিসেবে এনসিপিকেই কাছে টানছে জামায়াতÑ এটাই ভাবছেন তারা।
কারণ হিসেবে জামায়াত নেতৃত্বাধীন এগারো দলীয় জোটে থাকা এবং সাবেক শিবির নেতাদের অনেকের এনসিপিতে যুক্ত হওয়ার প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠেছে, এনসিপি কি আদর্শিকভাবে ডানপন্থার দিকে ঝুঁকছে কি-না। কেউ কেউ এনসিপিকে এমনকি ‘জামায়াতের বি-টিম’ হিসেবেও অভিযোগ করছেন।
দল গঠনের পরপরই দলটির শীর্ষ এক নেতা বলেছিলেন, এনসিপির একটি বড় দল হয়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে। আমরা জনগণের কাছে গিয়ে যে ধারণা পেয়েছি এবং একটা নতুন দলের আকাক্সক্ষা আছে জনগণের মধ্যে। বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি দীর্ঘসময় ধরে ক্ষমতায় ছিল। তাদেরকে মানুষ দেখেছে। কিন্তু এর বাইরে গিয়ে জনগণের একটা বিশাল অংশ আছে, যারা নতুন একটি রাজনৈতিক শক্তির আবির্ভাব দেখতে চায়। সে জায়গা থেকে আমরা মনে করি আমাদের দল গঠিত হলে সেটা জনসমর্থন পাবে। ধীরে ধীরে আমরা একটা বড় দল হতে পারবো।
কিন্তু শেষপর্যন্ত এনসিপি গঠন হওয়ার এক বছরেরও বেশি সময় পরে এখন অনেকেই বলছেন, এনসিপি বড় দল হয়ে ওঠার পরিবর্তে বরং জামায়াতের ছায়ায় ঢাকা পড়ছে। একইসঙ্গে ডানপন্থি রাজনীতির দিকে এনসিপি ঝুঁকে পড়েছে, এমন কথাও বলছেন রাজনীতি বিশ্লেষকদের কেউ কেউ। শুরুর সেই ধারণাটা এখন আর নেই। জামায়াতের সঙ্গে জোট করা থেকে শুরু করে বিভিন্ন কারণে এনসিপিকে মধ্যপন্থি দল বলার সুযোগ দেখছি না। এমনকি একটা দলের যে মেনিফেস্টো থাকে, তারা এতোদিনেও সেটা দিতে পারেনি। ফলে তাদের আদর্শ নিয়ে একটা দোলাচল আছেই।
এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব মীর আরশাদুল হক দল থেকে পদত্যাগ করে বিএনপিতে যোগ দেন। তিনি বলেন, তার এনসিপি ছাড়ার পেছনে অন্য অনেক কারণের মধ্যে জামায়াত ইস্যু ছিলো উল্লেখযোগ্য।
তবে এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম বলেন, এনসিপির ডানপন্থার দিকে ঝুঁকে যাওয়ার সুযোগ নেই। আমরা দেখেছি, বিএনপিও কিন্তু জামায়াতের সঙ্গে প্রায় ২৯ বছর ধরে জোটে ছিলো। এখানে কিন্তু বিএনপি জামায়াতের সঙ্গে বিলীন হয়ে যায়নি। কিংবা জামায়াতও বিএনপির সঙ্গে বিলীন হয়নি। বরং জামায়াত ধীরে ধীরে একটা বড় রাজনৈতিক দল হয়ে উঠেছে। এনসিপি কখনো জামায়াতের বি-টিম হওয়ার সুযোগ কম। কারণ মূল পার্থক্যটা আদর্শগত জায়গায়।
তিনি বলেন, জামায়াত ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল করে, ডানপন্থার রাজনীতি করে। আমরা এখানে মধ্যপন্থার রাজনীতি করি। বরং জামায়াতের সঙ্গে কিংবা ডানপন্থার সঙ্গে আমাদের রাজনীতির পার্থক্যটা স্পষ্ট হয়েছে।
সারজিস আলম বলেন, সংসদে যখন জামুকা বিল পাস হয় তখন এনসিপি স্পষ্টভাবেই সেখানে সমর্থন দিয়েছে। জামায়াত কী ভাববে সেটা বিবেচনা করেনি।
এনসিপি এখন বিভিন্ন দল থেকে বিভিন্ন মতাদর্শের লোককে যুক্ত করছে। এমনকি শর্তসাপেক্ষে ছাত্রলীগের লোকদেরও দলে ঢোকার সুযোগ আছে বলে জানাচ্ছেন দলটির নেতাদের কেউ কেউ। অতীতে ছাত্রলীগ বা আওয়ামী লীগের সাথে যুক্ত থাকলেও, যদি তাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো অপরাধ, খুন, গুম, দুর্নীতি বা জুলাইয়ের গণহত্যার সাথে জড়িত থাকার প্রমাণ না থাকে, তবে তারা এনসিপিতে যোগ দিতে পারবেন।
এ প্রসঙ্গে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম স্পষ্ট করেছেন, অতীতে কেউ ছাত্রদল, ছাত্রশিবির বা ছাত্রলীগ-যেই প্ল্যাটফর্মেই কাজ করুক না কেন, তা মুখ্য নয়। তাদের কাছে ব্যক্তির অতীত নয়, বরং বর্তমান আদর্শ এবং জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনার প্রতি দায়বদ্ধতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, যারা অতীতে আওয়ামী লীগের রাজনীতি করলেও কোনো ধরনের অপকর্ম বা গণমানুষের ওপর অত্যাচারের সাথে সরাসরি জড়িত ছিলেন না, তারা আসতে পারবেন। এনসিপিতে যোগ দিয়ে তাদের দলের আদর্শ মেনে কাজ করতে হবে।
এ প্রসঙ্গে রাজনীতি বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক জোবাইদা নাসরীন বলেন, এনসিপি বড় দল হয়ে ওঠার পরিবর্তে বরং জামায়াতের ছায়ায় ঢাকা পড়ছে। একইসঙ্গে ডানপন্থি রাজনীতির দিকে এনসিপি ঝুঁকে পড়েছে।
তিনি বলেন, যখন একটা দল নিজেকে গোছানোর আগে, রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরি করার আগেই একটা ক্ষমতার দিকে ঝুঁকে যায়, তখন দল হিসেবে বেশি জায়গা তারা পাবে না। কারণ এখন পর্যন্ত দেখেন মানুষ এটা ধরেই নিয়েছে যে, এনসিপির যারা এমপি হয়েছেন তারা জামায়াতের সমর্থনেই হয়েছেন। অর্থাৎ জামায়াত ছাড়া তাদের ভোট খুব একটা নেই।
জোবাইদা নাসরীন মনে করছেন, এখন যদি জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির সম্পর্ক দীর্ঘ হতে থাকে, তাহলে সেটা এনসিপিকে আরো দুর্বল করবে এবং আলাদা একটি রাজনৈতিক দল হয়ে ওঠার যে সম্ভাবনা সেটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
(মাজাহারুল ইসলাম)