বিশ্বসেরাদের সেরা তিনি। আর্জেন্টিনা ফুটবলে দিয়েগো ম্যারাডোনার যোগ্য উত্তরসূরী। রেকর্ড ব্যালন ডি’অর কিংবা অগণিত রেকর্ডের মালিক। একজন কিংবদন্তী ফুটবলার হতে হয়তো আর বেশি কিছু প্রমাণের ছিল না লিওনেল মেসির। তারপরও ঘুরেফিরে যে প্রশ্নটা এসেই যেত, সে কি বিশ্বকাপ জিততে পেরেছে? সব প্রশ্ন এসে যেন থামতো কখনো ছুঁয়ে না দেখা আরাধ্য সোনালী ট্রফি বরাবর। ২০১৪ বিশ্বকাপে খুব কাছাকাছি গিয়েও খালি হাতে ফিরতে হয়। ২০২২-এ অবশেষে কাতারের লুসাইল স্টেডিয়ামে সব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দেন আর্জেন্টাইন জাদুকর। সেই সঙ্গে দীর্ঘ শিরোপার অপেক্ষা শেষ হয় আর্জেন্টিনারও।
‘Lionel Messi has shaken hands with paradise. The little boy from Rosario, Santa Fe, has just pitched up in heaven. He climbs into a galaxy of his own….’, ফুটবলের কবি–খ্যাত পিটার ড্রুরি অদ্ভুত আবেগ আর মায়ার মিশেলে যখন কথাগুলো বলছিলেন, ততক্ষণে মেসি এবং আর্জেন্টিনার ভাগ্যটা নির্ধারণ হয়ে যায়। বিশ্ব ফুটবলে সর্বকালের অন্যতম সেরার তালিকায়ও উঠে যায় রোজারিওর জাদুকরের নাম।
লুসাইল স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে ছিলেন মেসি। যেন জীবনের সবচেয়ে বড় অপেক্ষার অবসান ঘটেছে। শুধু একটি শিরোপা নয়, শেষ হয়েছিল বহু বছরের চাপ, সমালোচনা আর অপূর্ণতার গল্পও। চার বছর পর, ২০২৬ বিশ্বকাপে মেসি ফিরেছেন সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতায়। এবার নতুন করে কিছু প্রমাণ করতে আসেননি। নেই কোনো শিরোপার ক্ষুধা, নেই নিজেকে সেরাদের কাতারে প্রতিষ্ঠার লড়াই। বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হিসেবে, ৩৮ বছর বয়সে, নিজের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলতে নেমেছেন তিনি—যে অভিজ্ঞতা ফুটবল ইতিহাসে আগে কারও হয়নি।
ফুটবল ইতিহাসে এই প্রথম বিশ্বের অন্যতম সেরা একজন খেলোয়াড় বিশ্বকাপে এসেছেন সব হিসাব চুকিয়ে। ক্যারিয়ারের কোনো অপূর্ণতা নেই, কোনো অসমাপ্ত অধ্যায় নেই। তিনি খেলছেন শুধুই খেলতে চাওয়ার আনন্দে। যেমনটা বলছিলেন, “শুরু থেকেই আমি উপভোগ করছি। আমি খুশি, প্রতিটি মুহূর্ত উপভোগ করছি এবং সব সময়ের মতোই রোমাঞ্চিত।”
কাতার বিশ্বকাপের পর মেসির ফুটবল দেখার দৃষ্টিভঙ্গিতেও এসেছে পরিবর্তন। একসময় আর্জেন্টিনা জার্সি মানেই ছিল দায়িত্বের পাহাড় আর প্রত্যাশার অসীম বোঝা। এখন সেটাই পরিণত হয়েছে উপভোগের মন্ত্রে। যে চাপ একসময় তাকে ভারাক্রান্ত করত, সেটিই এখন তার কাছে পরম পাওয়া। এই পরিবর্তনের প্রতিফলন দেখা গেছে ক্লাব ফুটবলেও। ২০২৫ মৌসুমে ইন্টার মায়ামির হয়ে ২৯ গোল ও ১৯ অ্যাসিস্ট করেছেন মেসি। জিতেছেন গোল্ডেন বুট। প্লে-অফে ছয় ম্যাচে ছয় গোল ও সাত অ্যাসিস্ট করে দলকে এনে দিয়েছেন প্রথম এমএলএস কাপ শিরোপা।
তবে মেসির গল্প কেবল পরিসংখ্যানের নয়। এটি মুক্তির গল্পও। গত ডিসেম্বরে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, “আমি দিন ধরে ধরে এগোই। যখন ভালো অনুভব করি, উপভোগ করি। আর যখন ভালো লাগে না, তখন সরে দাঁড়ানোই ভালো মনে করি।” এই কথার মধ্যেই যেন ফুটে ওঠে বর্তমান মেসিকে, যিনি আর বিশ্বের অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকেন না।
আর্জেন্টিনাও বদলে গেছে। একসময় জাতীয় দলকে টেনে নেওয়ার দায়িত্ব প্রায় একাই ছিল তার কাঁধে। এখন লিওনেল স্কালোনির দল এমন এক কাঠামো গড়ে তুলেছে, যারা মেসিকে ছাড়া খেলতে পারে, কিন্তু মেসিকে সঙ্গে পেলে আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এটাই হয়তো সবচেয়ে বড় পরিবর্তন।
২০১৪ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা ফাইনালে উঠেছিল অনেকটাই মেসির কাঁধে ভর করে। ২০২৬-এ এসে সমীকরণটা তার ঠিক উল্টো। এখন দলটি মেসির ওপর নির্ভরশীল নয় বরং তাকে ঘিরে আরও সমৃদ্ধ।
এই বিশ্বকাপ হবে মেসির ষষ্ঠ। এর আগে মেক্সিকোর আন্তোনিও কারবাহাল, জার্মানির লোথার ম্যাথাউস ও মেক্সিকোর রাফায়েল মার্কেস খেলেছেন পাঁচটি বিশ্বকাপ। এবার সেই রেকর্ড ভেঙে নতুন ইতিহাস গড়বেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। একই মাইলফলকে পৌঁছানোর পথে আছেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোও।
পেলে, ম্যারাডোনা কিংবা মেসি—প্রত্যেকেই নিজেদের সময়ের গল্প লিখেছেন নিজস্বভাবে। মেসির গল্পের পরিণতি এসেছে লুসাইলে। আর ২০২৬ বিশ্বকাপ সেই গল্পের নতুন অধ্যায়। কীভাবে শেষ হবে এই যাত্রা, তা এখনো অজানা। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত, এবারের মেসি আর কোনো বোঝা নিয়ে মাঠে নামছেন না। তিনি খেলছেন উপভোগের মন্ত্রে।