বিশ্বজুড়ে শিল্প খাত দ্রুত আরও প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠছে। অটোমেশন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, এবং ডিজিটাল প্রযুক্তি প্রসারের সঙ্গে বদলে যাচ্ছে কর্মক্ষেত্রের চাহিদাও। এই বৈশ্বিক পরিবর্তনের প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পেও। পোশাক শিল্পখাতে ভবিষ্যৎ প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে দক্ষ ও প্রযুক্তি-সক্ষম জনবল গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা আগের তুলনায় বেড়েছে।
এই লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয় ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগ আরও জোরদার করছে শ্রীলঙ্কাভিত্তিক পোশাক প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান এমএএস হোল্ডিংস (MAS Holdings)। তৈরী পোশাক শিল্প খাতে প্রযুক্তিগত, পরিচালনাগত ও প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রে আগামী প্রজন্মের নেতৃত্ব গড়ে তোলার জন্য শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করাই প্রতিষ্ঠানটির মূল লক্ষ্য।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অর্জিত জ্ঞান এবং আধুনিক পোশাক কারখানার বাস্তব কর্মক্ষেত্রে অনেকটা পার্থক্য আছে। এই দূরত্ব কমিয়ে শিক্ষার্থীদের কর্মজীবনের জন্য প্রস্তুত করাই শ্রীলঙ্কার এই পোশাক প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য। তাই বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কারিগরি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ, সিলেবাস উন্নয়ন, ল্যাব সুবিধা বৃদ্ধি এবং ইন্টার্নশিপের সুযোগ তৈরির মতো কার্যক্রম পরিচালনা করছে প্রতিষ্ঠানটি।
আধুনিক পোশাক খাতের ক্যারিয়ার এখন আর শুধুমাত্র উৎপাদনকেন্দ্রিক নয়; প্রযুক্তি, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং, ব্যবসা পরিচালনা, মার্কেটিং, ফিন্যান্স এবং টেকসই উৎপাদনের মতো নানা ক্ষেত্র এতে যুক্ত হয়েছে, আর এই দিকটিকেই গুরুত্ব দিচ্ছে এমএএস হোল্ডিংস। তাই শুধু কর্মী নিয়োগ নয়, তরুণদের কাছে পোশাক শিল্পকে একটি সম্ভাবনাময় ক্যারিয়ার হিসেবে তুলে ধরাও এই উদ্যোগের অংশ। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে বাংলাদেশে কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করছে এমএএস হোল্ডিংস। এর মধ্যে রয়েছে পোর্ট সিটি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি এবং বাংলাদেশ-কোরিয়া টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার (বিকেটিটিসি)। পোর্ট সিটি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির টেক্সটাইল বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য শিল্প-কারখানায় ব্যবহৃত সেলাই মেশিন সরবরাহ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। অন্যদিকে বিকেটিটিসির শ্রেণিকক্ষকে আধুনিক গার্মেন্টস প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে রূপান্তরে সহায়তা করেছে এমএএস হোল্ডিংস।
এর ফলে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার সময়ই শিল্পে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি, উৎপাদন পদ্ধতি এবং কর্মপরিবেশ সম্পর্কে বাস্তব ধারণা পাচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি একাডেমিক শিক্ষার সঙ্গে শিল্পখাতের চাহিদার দীর্ঘদিনের ব্যবধান কমাতে সহায়ক হবে। পাশাপাশি টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিংসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের জন্য ইন্টার্নশিপের সুযোগও তৈরি করছে এমএএস। এসব ইন্টার্নশিপে অংশ নেওয়া অনেক শিক্ষার্থী পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠানটিতে স্থায়ীভাবে চাকরি করার সুযোগও পেয়েছে।
এমএএস সুমান্ত্রার জেনারেল ম্যানেজার আদিত্য বান্দারা বলেন, “আজকের দিনে পোশাক খাতের ক্যারিয়ার শুধু ফ্যাক্টরির কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। প্রযুক্তি, ফিন্যান্স এবং পরিবেশবান্ধব পোশাক উৎপাদনের মতো অনেক বড় বড় ক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়েছে। অন্যদিকে, দক্ষতার ঘাটতি দূর করার মানে হলো পড়াশোনা ও প্রশিক্ষণকে মূল কর্মক্ষেত্রে চাহিদার কাছাকাছি নিয়ে আসা। এই কারণেই এমএএস সুমান্ত্রা শিক্ষার্থীদের সরাসরি কাজের অভিজ্ঞতা এবং কারিগরি, পরিচালনা ও প্রাতিষ্ঠানিক চাকরিতে আসার সুযোগ করে দিচ্ছে। আর বাংলাদেশের পোশাক খাতের জন্য ভবিষ্যতের উপযোগী দক্ষ কর্মী তৈরি করতেও আমরা কাজ করে যাচ্ছি।”
বিশ্বজুড়ে পোশাক শিল্প এখন অটোমেশন, ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং টেকসই উৎপাদনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এর সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত হচ্ছে দক্ষতার চাহিদাও। এমএএসের মতে, ফেব্রিক টেকনোলজি, প্যাটার্ন ডেভেলপমেন্ট, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং এবং উন্নত সেলাই প্রযুক্তি পরিচালনার মতো ক্ষেত্রে দক্ষ কর্মীর ঘাটতি রয়েছে। তাই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের এই দিকগুলো সম্পর্কে জানাতে চায় প্রতিষ্ঠানটি।
এছাড়া, শিক্ষার্থীরা বর্তমান বাজারের চাহিদা অনুযায়ী পড়াশুনা করার ধারণা পাচ্ছে এবং প্রাতিষ্ঠানিক সিলেবাস তৈরিতেও এমন উদ্যোগ সাহায্য করছে। উৎপাদনের প্রযুক্তি, পরিবেশবান্ধব পোশাক তৈরি এবং বিদেশে পোশাক রপ্তানির জন্য প্রয়োজনীয় কারিগরি দক্ষতার সম্পর্কে জ্ঞান অন্যতম প্রধান বিষয়।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কাছে শিল্পখাতের অভিজ্ঞতা এবং কর্মক্ষেত্রকে আরও দৃঢ়ভাবে তুলে ধরতে ভিজিটিং লেকচারার এবং খণ্ডকালীন শিক্ষক যুক্ত করার বিষয়েও কাজ করছে এমএএস। এ উদ্যোগে শ্রীলঙ্কাসহ প্রতিষ্ঠানটির আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের বিশেষজ্ঞদের যুক্ত করার পরিকল্পনা চলছে।
বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হয়েছে এমএএস। এর মধ্যে রয়েছে বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটি এবং পোর্ট সিটি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি। ২০২৬ সালে প্রতিষ্ঠানটি আরও কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পার্টনারশিপের পরিকল্পনা করছে। এর অংশ হিসেবে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন, ইস্ট ডেল্টা ইউনিভার্সিটি এবং নাসিরাবাদ পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পোশাক শিল্প বাংলাদেশের কর্মসংস্থান, উৎপাদন ও রপ্তানি আয়ের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। তাই দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য আরও দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে সহায়তা করতে চায় এমএএস। স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এমএএস হোল্ডিংসের উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের জন্য কর্মজীবনে প্রবেশের সুযোগ এবং দক্ষ জনবল তৈরিতে সহায়ক হবে। একইসাথে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা বৃদ্ধি, দেশের কর্মসংস্থান, উৎপাদন এবং রপ্তানিতে বড় অবদান রাখবে।