কাশ্মীরের পেহেলগামে পর্যটকদের ওপর সন্ত্রাসী হামলার জেরে সংঘাতে জড়ানো ভারত ও পাকিস্তান অন্তত চারটি গোপন বৈঠক করেছে, যাতে নীতি ও কৌশলবিদ, সংসদ সদস্য ও সাবেক কূটনীতিকরা অংশ নেন বলে খবর দিয়েছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম।
বিষয়টি নিয়ে অবগত সূত্রের বরাতে হিন্দুস্তান টাইমস লিখেছে, ভারতের ‘অপারেশন সিঁদুর’ এর দুই মাস বাদে প্রথম বৈঠকটি হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সূত্র বলছে, এর মধ্যে দুটি আধা-আনুষ্ঠানিক বৈঠকে সরকারি ও অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা অংশ নেন, যার মধ্যস্থতা করে লন্ডনভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (আইআইএসএস)। বাকি দুই বৈঠক ছিল একেবারেই অনানুষ্ঠানিক।
সবশেষ বৈঠক দোহায়
সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে হিন্দুস্তান টাইমস লিখেছে, ফেব্রুয়ারিতে কাতারের রাজধানী দোহায় সবশেষ বৈঠক হয়।
অনানুষ্ঠানিক বৈঠকটি নিয়ে হিন্দুস্তান টাইমস মন্তব্য জানতে চাইলে সাড়া দেননি ভারতীয় কর্মকর্তারা।
২০২৫ সালের ৭ থেকে ১০ মে পর্যন্ত চলা চার দিনের তীব্র সংঘাতের পর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ কার্যত নেই বললেই চলে। সেই যুদ্ধে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে পরস্পরকে আক্রমণ করার পর সংঘাত নিরসনে সম্মত হয় উভয়পক্ষ।
হিন্দুস্তান টাইমস লিখেছে, পাকিস্তানি জঙ্গি গোষ্ঠী লস্কর-ই-তৈয়বার ছায়া সংগঠন ‘দ্য রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট’ (টিআরএফ) পেহেলগামে আক্রমণ করার পর ভারত ‘অপরারেশন সিঁদুর’ শুরু করে।
লন্ডন বৈঠক
সংঘাতের দুই মাস বাদে জুলাই মাসে আইআইএসএসের উদ্যোগে লন্ডনে অনুষ্ঠিত আধা-আনুষ্ঠানিক বৈঠকে উভয়পক্ষের রাজনীতিবিদ, বিশেষজ্ঞ ও সাবেক কূটনীতিকরা অংশ নেন।
পাকিস্তানের প্রতিনিধি দলে বর্তমান সামরিক কর্মকর্তারা থাকলেও ভারতের তরফে দায়িত্বরত কর্মকর্তা অংশ নেননি।
পরবর্তী আলোচনা মাসকাটে
লন্ডনের বৈঠকের ধারাবাহিকতায় অক্টোবরে ওমানের রাজধানী মাসকাটে আইআইএসএসের সহায়তায় আরেকটি আধা-আনুষ্ঠানিক বৈঠক হয়।
কয়েক বছর ধরে লন্ডনের আইআইএসএস এবং ওয়াশিংটনের ন্যাশনাল ডিফেন্স ইউনিভার্সিটির নেয়ার ইস্ট সাউথ এশিয়া সেন্টার যৌথভাবে বাহরাইন ও ওমানে ‘দক্ষিণ এশিয়া নিরাপত্তা সম্মেলন’ আয়োজন করে আসছে।
অতীতে ভারত তার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পাকিস্তান-আফগানিস্তান-ইরান ডেস্কের প্রধান হিসেবে দায়িত্বরত যুগ্ম সচিবকে ‘দক্ষিণ এশিয়া নিরাপত্তা সম্মেলনে’ পাঠিয়েছে।
থাইল্যান্ড সংলাপ
গত ডিসেম্বরে থাইল্যান্ডে অনুষ্ঠিত ‘দ্য চাও ট্র্যাক’-এ (চাওপ্রয়া সংলাপ নামে পরিচিত) ভারত ও পাকিস্তানের বিশেষজ্ঞ, শিক্ষাবিদ, রাজনীতিক এবং সাবেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা অংশ নেন। নয়া দিল্লি ও ইসলামাবাদভিত্তিক দুটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ছিল এর আয়োজক।
সূত্র জানায়, এর ধারাবাহিকতায় দোহায় আরেকটি অনানুষ্ঠানিক বৈঠক হয়, যেখানে অংশগ্রহণকারীদের ধরন ছিল প্রায়ই একই রকম।
হিন্দুস্তান টাইমস লিখেছে, একটি কানাডিয়ান গবেষণা প্রতিষ্ঠান আরেকটি অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগের ব্যবস্থা করছে বলে খবর বেরিয়েছে। একসময় ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যোগাযোগের প্রায় ২০টি আলাদা অনানুষ্ঠানিক মাধ্যম থাকলেও বর্তমানে মাত্র ডজনখানেক সক্রিয় রয়েছে।
অপারেশন সিঁদুরের মাত্র কয়েক সপ্তাহ পর লন্ডনের আধা-আনুষ্ঠানিক বৈঠক সম্পর্কে অবগত দুটি সূত্র বলছে, তখন পরিবেশ উত্তেজনাপূর্ণ ছিল। তবে পরের বৈঠকগুলোতে পারস্পরিক আচরণ অনেকটা নমনীয় ও সংযত হয়ে আসে।
সূত্রগুলো বলছে, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের চরম টানাপড়েনের কারণে এই যোগাযোগগুলো অত্যন্ত গোপন রাখা হয়েছে। ভারত পেহেলগাম হামলার জবাবে সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিত করাসহ একাধিক কঠোর অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক ব্যবস্থা নিয়েছিল, যা দুই দেশের সম্পর্ককে কয়েক দশকের মধ্যে তলানিতে নিয়ে যায়।
তৃতীয় এক সূত্রের বরাক দিয়ে হিন্দুস্তান টাইমস লিখেছে, “এই যোগাযোগগুলো অন্তত আলোচনার একটি পথ খোলা রাখতে সহায়তা করে এবং দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনার মাত্রা বুঝতে সহায়তা করে, যা একটি মৌলিক উদ্দেশ্য পূরণ করছে।”