ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের চলমান অধিবেশন কক্ষে গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিল নিয়ে আলোচনা চলছে কিংবা কোনো সংসদ সদস্য জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বক্তব্য রাখছেন-ঠিক তখনই হুট করে বন্ধ হয়ে গেল সাউন্ড সিস্টেম। কখনো বা উচ্চঃস্বরে কর্কশ শব্দে কান পাতা দায় হয়ে পড়ছে। চলমান অধিবেশনে গত বেশ কয়েক দিন ধরে দেশের আইনসভার ভেতরে এমন চিত্র প্রায় নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
প্রশ্ন উঠেছে, এই বিপর্যয় কি সত্যিই কেবল কারিগরি সীমাবদ্ধতা, নাকি এর আড়ালে চলছে অর্থ আত্মসাতের এক সুপরিকল্পিত ‘ড্রামা’? সংসদ সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েক বছরে সংসদের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ও শব্দব্যবস্থা আধুনিকায়নের জন্য কয়েক দফা বড় অঙ্কের প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। অথচ কাজের কাজ কিছুই হয়নি।
অভিযোগ উঠেছে, দরপত্র প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে সরঞ্জাম কেনা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট কাজ করেছে। এই সিন্ডিকেটটি কম দামের নিম্নমানের সরঞ্জামকে উচ্চমূল্যের নামী ব্র্যান্ডের পণ্য হিসেবে দেখিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে বলে জোরালো গুঞ্জন রয়েছে।
অধিবেশন চলাকালীন ভোগান্তি সংসদের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, অধিবেশন চলাকালীন সাউন্ড সিস্টেম বিকল হওয়া এখন প্রাত্যহিক ঘটনায় দাঁড়িয়েছে। স্পিকারের বারবার নির্দেশ সত্ত্বেও কারিগরি বিভাগ দীর্ঘমেয়াদি কোনো সমাধান দিতে পারছে না। অনেক সময় দেখা যায়, মাইক্রোফোন চালু থাকলেও স্পিকারে শব্দ শোনা যাচ্ছে না, আবার কখনো স্পিকার থেকে বিকট শব্দ আসায় অধিবেশন সাময়িকভাবে স্থগিত রাখতে হচ্ছে। প্রবীণ সংসদ সদস্যরা একে সংসদের গাম্ভীর্যের পরিপন্থী বলে মনে করছেন। তাদের মতে, অতীতে যখন অ্যানালগ সিস্টেম ছিল, তখনো এমন বিপর্যয় দেখা যায়নি।
সাউন্ড সিস্টেমের এই ঘনঘন বিপর্যয়ের কারণ খতিয়ে দেখতে ইতিপূর্বে ছোটখাটো তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে সেসব কমিটির প্রতিবেদন আলোর মুখ দেখেছে খুব কমই। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এই খাতের দুর্নীতির শেকড় অনেক গভীরে। উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের যোগসাজশ ছাড়া এমন বড় আকারের অর্থ লোপাট অসম্ভব। নামমাত্র সংস্কার কাজ দেখিয়ে প্রতিবছর যে অর্থ বরাদ্দ নেওয়া হয়, তার বড় একটি অংশই নয়ছয় হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ফলে প্রতিটি তদন্তই শেষ পর্যন্ত দায়সারাভাবে শেষ হয় এবং মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যায়।
প্রাথমিকভাবে এটিকে প্রযুক্তিগত যান্ত্রিক সমস্যা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হলেও পরবর্তী অনুসন্ধানে উঠে আসছে উদ্বেগজনক তথ্য। এরই মধ্যে সংসদের বিশেষায়িত সাউন্ড সিস্টেম প্রকল্পকে ঘিরে কোটি কোটি টাকার অনিয়ম ও অর্থ পাচারের অভিযোগ পেয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এ ঘটনায় এরই মধ্যে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। পাশাপাশি জাতীয় সংসদের পক্ষ থেকেও বিষয়টি খতিয়ে দেখতে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
জাতীয় সংসদের সাউন্ড সিস্টেম দুর্নীতির অনুসন্ধানের দায়িত্বে রয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) বিশেষ অনুসন্ধান ও তদন্ত-১ শাখা। অনুসন্ধানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গণপূর্ত অধিদফতরের সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের যোগসাজশে কমিউনিকেশন টেকনোলজি লিমিটেডের সিইও জাহিদুর রহিম জোয়ারদার জাতীয় সংসদের সাউন্ড সিস্টেম প্রজেক্ট থেকে কয়েকশ কোটি টাকা আত্মসাৎ ও দেশের বাইরে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার করেছেন। এ অভিযোগে ২০২৫ সালের এপ্রিলেই অনুসন্ধান শুরু করেন দুদকের সহকারী পরিচালক প্রবীর কুমার দাস।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে জাহিদুর রহিম জোয়ারদার দীর্ঘদিন জাতীয় সংসদ ভবনের প্ল্যানারি হলের ‘এসআইএস’ সিস্টেম পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করতেন। অভিযোগ রয়েছে, উন্নয়ন কাজের আড়ালে ‘ওভার ইনভয়েসিং’ বা প্রকৃত মূল্যের চেয়ে অতিরিক্ত দাম দেখিয়ে বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ বিদেশেও পাচার করেছেন তিনি।
কমিউনিকেশন টেকনোলজি লিমিটেডের সিইও জাহিদুর রহিম জোয়ারদার সাবেক চিফ হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরীর (লিটন চৌধুরী) ঘনিষ্ঠজন বা ক্যাশিয়ার হিসেবে পরিচিত ছিলেন। এছাড়া সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের ভায়রা ভাই পরিচয় দিয়ে ক্ষমতার দাপট দেখাতেন। তিনি জাতীয় সংসদ ভবনের প্ল্যানারি হলে (অধিবেশন হল) স্থাপিত সাউন্ড সিস্টেম পরিচালনা, মেরামত, সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের নামে শত কোটি সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করে বিদেশে পাচার করেন। একইসঙ্গে তার বিরুদ্ধে স্বাস্থ্য খাতে মেডিক্যাল ইকুইপমেন্ট সরবরাহের নামে শত শত কোটি টাকা আত্মসাৎ এবং ওভার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে অর্থ পাচারের অভিযোগেরও অনুসন্ধান করছে দুদক।
দুদক সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের দিন ছাত্র-জনতা জাতীয় সংসদে ঢুকে পড়লে অধিবেশন কক্ষের সাউন্ড সিস্টেম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এটি একটি বিশেষায়িত সিস্টেম-সাইমালটেনিয়াস ইন্টারপ্রেটেশন সিস্টেম। এই সিস্টেমে রিয়েল-টাইম ভাষা অনুবাদ সম্ভব। ফলে বক্তারা কোনও বাধা ছাড়াই বক্তব্য চালিয়ে যেতে পারেন এবং শ্রোতারা যে ভাষায় শুনতে চান, সেই ভাষায় শুনতে পারেন।
নির্বাচনের পর যে সংসদ বসবে, সেখানে যাতে কোনও সমস্যা না হয়- সে জন্য সিস্টেমটি মেরামত করে চালুর উদ্যোগ নেয় গণপূর্ত অধিদফতর। তখন জাহিদুর রহিম জোয়ারদারের প্রতিষ্ঠান সাউন্ড সিস্টেম মেরামত করে চালু করা সম্ভব বলে মতামত দিয়ে প্রাক্কলন দাখিল করে। পরবর্তীকালে কমিউনিকেশন টেকনোলজি লিমিটেড পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য প্রকৌশলীদের আসা-যাওয়া, থাকা-খাওয়া ও সম্মানী বাবদ ১১ লাখ ২৫ হাজার টাকার জন্য গণপূর্ত অধিদফতরের নির্বাহী প্রকৌশলী বরাবর আবেদন করে। পাশাপাশি পুরো সিস্টেম মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রায় চার কোটি টাকার উচ্চমূল্যের প্রাক্কলনও দেওয়া হয়।
দুদক সূত্র অনুযায়ী, জাতীয় সংসদ ভবনের প্ল্যানারি হলে স্থাপিত এসইউআরই ব্র্যান্ডের সাউন্ড সিস্টেমের সমমানের প্রযুক্তিগত বা প্রকৌশল বৈশিষ্ট্য (স্পেসিফিকেশন) বিশিষ্ট পণ্য বর্তমানে সংশ্লিষ্ট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বা অন্য কোনও প্রতিষ্ঠান উৎপাদন না করলেও কমিউনিকেশন টেকনোলজি লিমিটেড অর্থ আত্মসাতের পাঁয়তারা অব্যাহত রাখে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে ও পরে গণপূর্তের কিছু প্রকৌশলী ও কর্মকর্তার যোগসাজশে পুরোনো সিস্টেম মেরামতের নামে অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।
দুদক কর্মকর্তারা জানান, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় গত ১২ ফেব্রুয়ারি। ১৭ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রিপরিষদের শপথ গ্রহণের মাধ্যমে সরকার গঠন হয়। তার আগেই ১৬ ফেব্রুয়ারি এই দুর্নীতির অনুসন্ধানে জরুরি ভিত্তিতে গণপূর্ত অধিদফতরের সংশ্লিষ্ট সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর কাছে নথিপত্র চেয়ে চিঠি দেওয়া হয়। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কোনও সাড়া না পেয়ে ২৪ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় দফায় চিঠি দেওয়া হয়। এ দফায়ও কোনও সাড়া পায়নি দুদক। এরই মধ্যে সংসদ অধিবেশন শুরু হলে সাউন্ড সিস্টেম নিয়ে নানা অভিযোগ করতে থাকেন সংসদ সদস্যরা। সাউন্ড সিস্টেমের জটিলতার কারণে একাধিকবার সংসদ অধিবেশন মুলতবিও করতে হয়েছে। এরপর গত ৭ এপ্রিল ‘বিষয়টি অতীব জরুরি’ উল্লেখ করে দুদকের তৃতীয় চিঠিতে বলা হয়, পরবর্তী সাত দিনের মধ্যে প্রয়োজনীয় নথিপত্র দুদকের কাছে হস্তান্তর করতে।
গত ৮ এপ্রিল সরকারি দলের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি সাংবাদিকদের জানান, সংসদের সাউন্ড সিস্টেম সমস্যা জটিল আকার ধারণ করেছে। অধিবেশন চলমান থাকায় এখনও কিছু করা যায়নি। সমস্যার কারণে ওইদিন অধিবেশন শুরু করতে আধাঘণ্টা বিলম্ব হয়েছিল।
নুরুল ইসলাম মনি এই সাউন্ড সিস্টেমের এমন পরিস্থিতির জন্য বিগত আওয়ামী লীগ সরকারকে দায়ী করে বলেন, ওই সময় একটি ফ্যাসিস্ট সরকার ছিল, তারা নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানকে কাজের চুক্তি দিয়েছিল। সাউন্ডের ব্যাপারে নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান কী কাজে লাগতে পারে? এ কাজটা বুঝে নেবে এমন কোনও লোক নিয়োগ দেওয়া হয়নি। ৩৮ গ্রামের হেডফোন দেওয়ার কথা ছিল, কিন্তু হেডফোন দেওয়া হয় ২৫৮ গ্রামের। ফলে এটি মাথায় রাখতেও সদস্যদের সমস্যা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০২২ সালে এই সাউন্ড সিস্টেম স্থাপন করা হলেও এর কোনও ওয়ারেন্টি ছিল কিনা, মাইকের কার্যকারিতা কত দিন থাকবে- তার কোনও দায়দায়িত্ব ছিল না। খুবই দায়িত্বহীনভাবে এই গুরুত্বপূর্ণ বড় কাজটি করা হয়েছে। সাউন্ড সিস্টেম কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িত গণপূর্ত ই/এম বিভাগ-৭-এর নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেনকে অন্যত্র বদলি করার পর জড়িত আরও একাধিক প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে। একইসঙ্গে সাউন্ড সিস্টেম মেরামতের কার্যাদেশ পাওয়া প্রতিষ্ঠান আমানত এন্টারপ্রাইজের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তারা।
গত ৯ এপ্রিল দুদকের অনুসন্ধানের বিষয়ে সাংবাদিকদের কাছে কিছু তথ্য তুলে ধরেন দুদকের উপপরিচালক মো. আকতারুল ইসলাম। তিনি জানান, জাতীয় সংসদ ভবনের প্ল্যানারি হলের (অধিবেশন হল) সাউন্ড সিস্টেম পরিচালনা, মেরামত এবং রক্ষণাবেক্ষণের নামে অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে দুদকের অনুসন্ধান চলছে।
আকতারুল ইসলাম জানান, দুদকের বিদায়ী কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রধান কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক প্রবীর কুমার দাসকে অনুসন্ধান কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট দফতর থেকে প্রয়োজনীয় নথিপত্র চেয়ে একাধিকবার চিঠি পাঠানো হয়েছে। রেকর্ডপত্র পাওয়ার পর বিধি অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি জানান, বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) সকালে কমিউনিকেশন টেকনোলজি লিমিটেডের সিইও জাহিদুর রহিম জোয়ার্দারকে দুদকে তলব করা হয়েছে। অভিযোগের বিষয়ে তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়।
তিনি বলেন, গণপূর্ত অধিদফতরের কাছে চার ধরনের গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র চাওয়া হয়েছে। সেগুলো হচ্ছে-এসআইএস সিস্টেম পরিচালনা, মেরামত ও সংস্কারের কার্যাদেশ ও টেন্ডার সংক্রান্ত সব রেকর্ড, মালামাল ক্রয়ের চাহিদাপত্র, প্রশাসনিক অনুমোদন, বাজার যাচাই প্রতিবেদন ও দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির রেজুলেশন, বিল পরিশোধের ভাউচার, স্টক রেজিস্টার, নোটশিট ও নিরীক্ষা প্রতিবেদন এবং ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ কমিটির প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র।
এ ছাড়া দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলীদের নাম, পদবি ও বর্তমান ঠিকানাসহ পূর্ণাঙ্গ তথ্যও চাওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল কি না এবং কীভাবে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে কাজ পেয়েছে, সেসব বিষয়ও অনুসন্ধানের আওতায় আনা হয়েছে।
(মাজাহারুল ইসলাম, বিশেষ প্রতিবেদক)