ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতের অবসান ঘটলে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে নাটকীয় পরিবর্তন আসতে পারে। ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের চিরশত্রু হিসেবে ইরানের জায়গা দখল করতে পারে তুরস্ক অথবা পাকিস্তান। ইসরায়েলি দৈনিক মাআরিভ-এ প্রকাশিত এক নিবন্ধে এমন চাঞ্চল্যকর পূর্বাভাস দিয়েছেন বিশ্লেষক বোয়াজ গোলানি।
‘পরিবর্তনশীল বালুচর’ শিরোনামের ওই নিবন্ধে গোলানি উল্লেখ করেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধের আলোচনা চললে তেহরানকে ইসরায়েলের ‘প্রধান শত্রু’র তকমাটি অনিচ্ছা সত্ত্বেও ত্যাগ করতে হতে পারে। আর সেই শূন্যস্থান পূরণে এখন পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে এক ধরনের অদৃশ্য প্রতিযোগিতা চলছে।
গোলানি তার নিবন্ধে লিখেছেন, আলি খামেনির অধীনে ইরান গত তিন দশক ধরে ইসরায়েলের বড় শত্রুর ভূমিকাটি বিশ্বস্ততার সঙ্গে পালন করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে।
তবে তার দাবি, সাম্প্রতিক যুদ্ধ এবং অর্থনৈতিক বিপর্যয় ইরানকে সামরিকভাবে পঙ্গু করে দিয়েছে। ফলে ইসরায়েলের জন্য এখন নতুন কোনও ‘শত্রু রাষ্ট্র’ সামনে আসা সময়ের ব্যাপার মাত্র।
তুরস্ক ও পাকিস্তান কেন আলোচনায়?
এই দৌড়ে তুরস্ক ও পাকিস্তান এগিয়ে থাকার পেছনে বোয়াজ গোলানি বেশ কিছু মিল খুঁজে পেয়েছেন। তিনি বলেন, ‘প্রতিযোগিতাটি মূলত তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। তুরস্কের জনসংখ্যা ৮.৫ কোটি এবং পাকিস্তানের ২৪ কোটি। উভয় দেশই সুন্নি সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং সেখানে সামরিক শক্তির ওপর নির্ভরশীল কর্তৃত্ববাদী শাসন ব্যবস্থা বিদ্যমান। আশ্চর্যের বিষয় হলো, উভয় দেশের সঙ্গেই ইসরায়েলের প্রধান মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের সুসম্পর্ক রয়েছে।’
তুরস্কের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা
গাজায় চলমান গণহত্যা এবং সিরিয়ায় প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে গত এক সপ্তাহে ইসরায়েল ও তুরস্কের মধ্যে উত্তেজনা চরম আকার ধারণ করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) এক পোস্টে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তুর্কি প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোয়ানকে আক্রমণ করে বলেছেন, এরদোয়ান ‘নিজের কুর্দি নাগরিকদের গণহত্যা করছেন’ এবং ‘ইরানের সন্ত্রাসী শাসন ও তাদের প্রক্সিদের মদত দিচ্ছেন।’
নেতানিয়াহুর এই আক্রমণাত্মক বার্তার পেছনে আঙ্কারার সঙ্গে গ্রিস ও সাইপ্রাসের ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতাকে কারণ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। তবে মজার বিষয় হলো, গোলানি উল্লেখ করেছেন যে গ্রিসের শ্যাডো শিপ বা নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ব্যবহৃত জাহাজ এখনও তুরস্কের জেহান বন্দর হয়ে ইসরায়েলে তেল ও সামরিক সরঞ্জাম পৌঁছে দিচ্ছে।
পাকিস্তানের অবস্থান ও কড়া সমালোচনা
অন্যদিকে, ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ বন্ধে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় থাকা পাকিস্তান বরাবরই ইসরায়েলের কড়া সমালোচক। সম্প্রতি পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ এক্সে এক পোস্টে ইসরায়েলকে ‘অশুভ’ এবং ‘মানবতার জন্য অভিশাপ’ বলে অভিহিত করেছিলেন। যদিও পরে সেই পোস্টটি মুছে ফেলা হয়, তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদল ইসলামাবাদে পৌঁছানোর ঠিক আগমুহূর্তে এমন মন্তব্য বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
নিবন্ধের শেষে গোলানি সতর্ক করে বলেন, ‘ইরানের বিরুদ্ধে লড়াই অবসান হওয়ার পরপরই এই দুই দেশের যেকোনও একটির সঙ্গে সরাসরি সংঘাত পরিস্থিতির জন্য ইসরায়েলকে প্রস্তুত থাকতে হবে। এদের মধ্যে কাউকে বেছে নেওয়ার সুযোগ আমাদের হাতে নেই এবং উভয় বিকল্পই আমাদের জন্য সমান খারাপ। এই দেশগুলোকে মোকাবিলা করার একমাত্র প্রধান হাতিয়ার হলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক, যা আমাদের সর্বশক্তি দিয়ে রক্ষা করতে হবে।’
সূত্র: মিডল ইস্ট আই