বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ১ সেপ্টেম্বর। চলতি বছর এই প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিনেই দলটির কাউন্সিল হওয়ার কথা রয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়। দলটির সর্বশেষ কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী তিন বছর পরপর বিএনপির কাউন্সিল হওয়ার কথা থাকলেও এক দশকেও তা হয়নি। তবে এই সময়ে নির্বাহী কমিটিতে একাধিকবার পরিবর্তন আনা হয়েছে। যুক্ত হয়েছে নতুন মুখ। কেউ পদোন্নতি পেয়েছেন, আবার কেউ দায়িত্ব থেকে সরে গেছেন।
বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ায় গঠনতন্ত্রের ৭(গ) ধারা অনুযায়ী ৮ বছর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্বে থাকা তারেক রহমান। তবে গত ৩০ ডিসেম্বর খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর গত ৯ জানুয়ারি স্থায়ী কমিটির বৈঠকে তিনি ভারমুক্ত হয়ে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান। আর মহাসচিব হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দায়িত্বগ্রহণ করেন ২০১৬ সালের কাউন্সিলে।
সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘ ১০ বছর পর হতে যাচ্ছেন বিএনপির এই কাউন্সিল। এবারের কাউন্সিল অতীতের তুলনায় বিস্তৃত ও ব্যাপক অংশগ্রহণমূলক করার পরিকল্পনা দলটির। কেন্দ্রের পাশাপাশি তৃণমূল পর্যায়েও সম্পৃক্ততা বাড়ানোর পরিকল্পনা শীর্ষ নেতৃবৃন্দের। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় নিয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি।
বিএনপির দলীয় নেতাদের অনেকের ধারণা, সংসদ ও মন্ত্রিসভার দায়িত্বে যুক্ত হয়েছেন দলের মূল ও অঙ্গসংগঠনের অনেক নেতা। ফলে দলীয় সাংগঠনিক কার্যক্রমে তাদের সময় ও মনোযোগ কমে গেছে। এর ফলে সাংগঠনিক কার্যক্রম কিছুটা থমকে গেছে। এতে সংগঠনের সাংগঠনিক কার্যক্রমে কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড বাড়াতে কাউন্সিল জরুরি বলে মনে করছেন দলটির হাইকমাণ্ড।
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি স্থায়ী কমিটির এক বৈঠকে দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে দ্রুত সাংগঠনিক পুনর্বিন্যাসের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। স্থায়ী কমিটির বৈঠকেও জানা যায়, সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন থাকায় দলীয় নেতারা সাংগঠনিক শক্তি বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠেছে ঐ বৈঠকে। এমনকি কাউন্সিল আয়োজনের প্রস্তুতি জোরদার করেছে দলের কেন্দ্রীয় কমিটি।
এছাড়া, সম্প্রতি এক বেসরকারি টেলিভিশনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আমি খুবই ক্লান্ত। আগামী কাউন্সিল পর্যন্ত থাকতে হচ্ছে রাজনীতিতে। কাউন্সিলের পর অবসর নিতে চাই রাজনীতি থেকে। আমার অনেক বয়স হয়ে গেছে। অসুস্থ হয়ে যাচ্ছি। আসন্ন কাউন্সিলে মহাসচিব পদে নতুন মুখ আসবে বলেও উল্লেখ করেছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
দলীয় সূত্র বলছে, দলটির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিনেই কাউন্সিল হওয়ার সম্ভবনা বেশি। আসন্ন কাউন্সিলকে সামনে রেখে বিএনপির এই গুরুত্বপূর্ণ পদে সম্ভাব্য নতুন মুখ নিয়ে চলছে ব্যাপক জল্পনা-কল্পনা। নতুন মহাসচিব হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। তিনি দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণে তার দক্ষতা এবং দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় তিনি সম্ভাব্য মহাসচিব হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন।
এছাড়া মাঠের রাজনীতিতে দলীয় নেতাকর্মীর মধ্য ব্যাপক আলোচনা রয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী। দীর্ঘদিন দলের দপ্তর ও সাংগঠনিক কার্যক্রম সামলানোর অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। দলের দুঃসময়ে অথাৎ বিগত ১৭ বছর ফ্যাসিবাদী হাসিনার হামলা-মামলা, নির্যাতন-নীপিড়ন ও জেল-জুলুমের শিকার হয়েও মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয় থাকায় তৃণমূলেও গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে রিজভীর। নিয়মিত ব্রিফিং করে দলে নেতাকর্মীদের উৎসাহ-অনুপ্রেরণা যুগিয়ে রাখতেন তিনি। দলের মহাসচিব পদে আলোচনায় রয়েছে অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভীর নামও।
দলীয় নেতারা বলছেন, অভিজ্ঞতা, গ্রহণযোগ্যতা ও সাংগঠনিক দক্ষতা- এই তিন মানদণ্ডেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এ প্রসঙ্গে দলটির স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য বলেন, কে মহাসচিব হচ্ছেন, তা নির্ভর করবে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও হাইকমান্ডের সিদ্ধান্ত এবং কাউন্সিলের ওপর।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, অতীতের চেয়ে এবারের কাউন্সিল নিয়ে আমাদের প্রত্যাশা অনেক। কারণ বিগত ফ্যাসিবাদের সময় আমাদের সাংগঠনিক কাজে নানা প্রতিকূলতা ছিল। তাই কেন্দ্রীয় কাউন্সিল হতো সাদামাটা। আশা করি এবারের কাউন্সিল হবে উৎসবমুখর। এতে দলের সর্বস্তরে আসবে নতুন নেতৃত্ব। তিনি জানান, শিগগিরই কাউন্সিলের পথনকশা ঘোষণা করা হবে।
দলীয় একাধিক সূত্রে জানা গেছে, বিএনপির স্থায়ী কমিটির ১৯ জন সদস্য থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে ১৪ জন সদস্য নিয়ে কমিটি পরিচালিত হচ্ছে স্থায়ী কমিটি। তাদের মধ্যেও কয়েকজন বয়সজনিত কারণে অসুস্থ বলে জানা গেছে।
স্থায়ী কমিটিসহ গুরুত্বপূর্ণ একাধিক পদে আসছে নতুন নেতৃত্ব আসছে, এটা প্রায় নিশ্চিত। নতুন কমিটিতে স্থান পাবেন যোগ্য ও ত্যাগীরা। আলোচনায় আছেন অনেকে। এবারের সপ্তম কাউন্সিলে দলের স্থায়ী কমিটির শূন্যপদ পূরণ করা হবে। এতে স্থান পেতে পারেন বেশ কয়েকজন নেতা। এর মধ্যে আলোচনায় আছেন রুহুল কবির রিজভী, জয়নুল আবদীন ফারুক, শামসুজ্জামান দুদু, আব্দুল আউয়াল মিন্টু, সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল ।
আরেকটি সূত্র জানিয়েছে, পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে স্থায়ী কমিটির সদস্য সংখ্যাও বাড়ানো হতে পারে।
স্থায়ী কমিটির সর্বশেষ চিত্র : বিএনপি কেন্দ্রীয় কমিটি একাধিক ফোরামে বিভক্ত। স্থায়ী কমিটি, ভাইস চেয়ারম্যান, যুগ্ম মহাসচিব, চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা, সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটি। সর্বশেষ ২০১৬ সালের কাউন্সিলের আগে স্থায়ী কমিটির সদস্যের পদ রাখা হয় ১৯টি। তবে নানা কারণে পুরোপুরি কোরাম পূরণ করা সম্ভব হয়নি বলে জানা গেছে। সর্বশেষ ২০২৪ সালের ১৬ আগস্টের তথ্য অনুযায়ী এ ফোরামে ছিলেন ১৬ জন। সে সময় নতুন করে স্থায়ী কমিটিতে যুক্ত হন মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম ও অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন।
এরই মধ্যে মারা যান বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। আর স্পিকারের দায়িত্ব পাওয়ায় পদ ছাড়েন হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
বর্তমানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্যরা হলেন-পদাধিকার বলে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। অন্যদের মধ্যে রয়েছেন ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার, রফিকুল ইসলাম মিয়া, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, সেলিমা রহমান, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু ও এজেডএম জাহিদ হোসেন। সাংগঠনিক কাজে অনেকেই সক্রিয় থাকলেও কয়েক বছর শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী স্থায়ী কমিটির সিনিয়র সদস্য ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া। গত রমজান থেকে অসুস্থ হয়ে দেশের বাইরে চিকিৎসাধীন আরেক সদস্য মির্জা আব্বাস।
(মাজাহারুল ইসলাম)