*জাতীয় নির্বাচনের মতো জোট হওয়ার সম্ভাবনা কম: আযাদ
*আমরা স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছি: সালেহ উদ্দিন
*ছয় সিটি মেয়র, পৌরসভা চেয়ারম্যান-মেয়র পদে ১০০ প্রার্থী ঘোষণা এনসিপির
জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় জোট জামায়াতে ইসলামী এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মধ্যে ক্রমশ দূরত্ব বাড়ছে-এমনই চিত্র ফুটে উঠেছে রাজনৈতিক বিশ্লেষকসহ রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টিতে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সদ্য সমাপ্ত সংসদীয় অধিবেশনে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিল ও জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে বিরোধী জোটের ঐক্যবদ্ধ অবস্থান দেখা যাওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে ঘটেছে তার উল্টো। কৌশলগত অবস্থান, আদর্শিক সংঘাত এবং আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রার্থিতা নিয়ে মতভেদ এখন প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নিজস্ব সাংগঠনিক ভিত্তি শক্তিশালী করতে এককভাবে প্রার্থী দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে এনসিপি। একক প্রার্থী ঠিক করে রেখেছে জামায়াতও। জুলাই সনদ প্রসঙ্গে যদিও তারা ১১ দলীয় জোটের অংশ এবং জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একসাথে লড়েছেন। এমনকি জাতীয় সংসদেও ঐক্যবদ্ধভাবে বিরোধী দলের ভূমিকায় দায়িত্ব পালন করছেন। কাজেই জামায়াত ও এনসিপি একই জোটে থাকলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তারা আলাদাভাবে, এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে মুখোমুখি হওয়ার প্রস্তুতি রয়েছে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মাঠ পর্যায়ে নিজেদের প্রভাব বিস্তার এবং এককভাবে প্রার্থী দেওয়ার প্রশ্নে উভয় দলই বর্তমানে অনড় অবস্থানে রয়েছে। জামায়াতে ইসলামী তাদের সুসংগঠিত সাংগঠনিক কাঠামোর ভিত্তিতে বেশিসংখ্যক আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চায়। অন্যদিকে, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিত্বের দাবি তুলে নিজেদের জন্য বড় অংশ দাবি করছে, যা নিয়ে দুই দলের মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, স্থানীয় নির্বাচনে এই দুই দলের আলাদা পথে চলা বা ঐক্যবদ্ধ হতে না পারা তাদের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমীকরণে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। নির্বাচনী কৌশল এবং প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে মতপার্থক্যের কারণে এই দুই দলের মধ্যকার সম্পর্কে ফাটল ধরার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে বলেও মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
দলীয় সূত্রগুলো বলছে, নীতি-নির্ধারণী অনেক বিষয়ে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি একে অপরের থেকে আলাদা পথে হাঁটছে। বিশেষ করে জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের যে শক্তিশালী ভূমিকা রাখার কথা ছিল, তা এই অভ্যন্তরীণ দূরত্বের কারণে ব্যাহত হচ্ছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
আন্দোলনের কৌশল এবং আগামীদিনের সংসদীয় পদচারণা নিয়ে দুই দলের নেতৃত্বের মধ্যে গভীর মতভেদ তৈরি হয়েছে। এনসিপি যেখানে কিছুটা মধ্যপন্থা অবলম্বন করতে চাইছে, সেখানে জামায়াতে ইসলামীর নিজস্ব রাজনৈতিক এজেন্ডা ও কৌশল জোটের সংহতিকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। সংসদীয় উপকমিটির সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং বক্তৃতার সুযোগ বণ্টনের মতো ছোটখাটো বিষয়েও এখন দুই দলের মধ্যে ঠাণ্ডা লড়াই চলছে।
সূত্রমতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রথম ধাপে উপজেলা ও পৌরসভা নির্বাচনে চেয়ারম্যান ও মেয়র পদে দলসমর্থিত ১০০ প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে এনসিপি। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণসহ ছয় সিটিতে মেয়র পদে প্রার্থী ঘোষণা করেছে এনসিপি। তারা মাঠে প্রচারণাও শুরু করেছে। অপরদিকে জামায়াত জানিয়েছে, তফসিল ঘোষণার পর আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থীদের নাম প্রকাশ করা হবে।
তবে এরই মধ্যে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াতের এক অনুষ্ঠানে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে (ডিএসসিসি) মেয়র পদে ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েমের নাম অনানুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়েছে। অপরদিকে, একই পদে এনসিপি আগেই আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াকে প্রার্থী ঘোষণা করেছে। ফলে সমঝোতা না হলে দুই দলের প্রার্থীদের সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দেখা যেতে পারে।
গত ৪ মে জামায়াত-সমর্থিত সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার এ এস এম শাহরিয়ার কবির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, এনসিপিকে বিদায় জানানোর সময় হয়েছে। এতে জোটের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা আরও জোরালো হয়েছে। এ নিয়ে উভয়পক্ষের অ্যাক্টিভিস্টরাও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পক্ষে-বিপক্ষে নানা প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন। তবে দুই দলের দায়িত্বশীল পর্যায়ের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নিজেদের সাংগঠনিক সক্ষমতা দেখাতে চায় উভয় দলই। ফলে এককভাবে নির্বাচন করার আলোচনা জোরালো হচ্ছে। যদিও এনসিপির একটি অংশ ঢাকার অন্তত একটি সিটিতে সমঝোতা চায়।
এনসিপির অবস্থান: এনসিপি এক শীর্ষ নেতা জানিয়েছেন, পার্টি নিজেদের স্বাধীন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে চায়, তাই তারা স্থানীয় নির্বাচনগুলোতে নিজেদের প্রার্থী দিচ্ছে।
জামায়াতের অবস্থান: জামায়াতে ইসলামীও তাদের নিজস্ব প্রার্থীর তালিকা চূড়ান্ত করছে এবং কোনো ধরনের ছাড় না দিয়ে এককভাবে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানা যায়।
এ প্রসঙ্গে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়নি। তফসিল ঘোষণার পর দলীয় সিদ্ধান্ত জানানো হবে। জাতীয় নির্বাচনের মতো জোট হওয়ার সম্ভাবনা কম।
এ বিষয়ে এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব সালেহ উদ্দিন সিফাত বলেন, আমরা স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছি। পরবর্তী সময়ে দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অবস্থান নির্ধারণ হবে। তবে ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবিরের মন্তব্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি তার ব্যক্তিগত মতামত।
(মাজাহারুল ইসলাম)