ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনার জেরে লাইসেন্স বাতিল হওয়া আদ্-দ্বীন হাসপাতাল ছাড়ছেন চিকিৎসাধীন রোগীরা।
শুক্রবার দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত ১৭৬ জন রোগী চলে গেছেন বলে জানিয়েছেন আদ দ্বীন ফাউন্ডেশনের পরিচালক (কোম্পানি অ্যাফেয়ার্স) তারিকুল ইসলাম মুকুল।
তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, বৃহস্পতিবার বিকালে যখন লাইসেন্স বাতিল ঘোষণা করা হয়, তখন ৪২৬ জন রোগী ভর্তি ছিলেন।
“বর্তমানে প্রায় ২৫০ জনের মতো রোগী ভর্তি আছেন। বাকিরা বিভিন্ন সময় চলে গেছে।”
নারায়ণগঞ্জ থেকে আসা আনিসুর রহমান দুপুরে বলেন, “আমার বাচ্চাকে এক সপ্তাহ আগে ভর্তি করিয়েছিলাম। গতকাল থেকেই সুস্থ, তাই আজ রিলিজ দিয়ে দিয়েছে। আমরা একটু পর চলে যাব।”
সাতক্ষীরা থেকে আসা বি এম রাসেল বললেন, “আমার স্ত্রীর ফ্যাটি লিভারসহ আরো কিছু শারীরিক জটিলতা ছিল। এখানে চার দিন ছিলাম। আজ রিলিজ দিয়ে দিয়েছে, তাই চলে যাচ্ছি। তবে হাসপাতাল বন্ধ হয়ে গেলে বর্তমানে চলা ট্রিটমেন্ট কীভাবে হবে সেটি চিন্তার বিষয়।
“এখানের ডাক্তারের মাধ্যমে সুস্থ হয়েছে। সামনেও ফলোআপ ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে। কীভাবে এই ডাক্তারকে পাব, সেটি বুঝতে পারছি না।”
হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, বর্তমানে জরুরি বিভাগে কোনো রোগী ভর্তি নেওয়া হচ্ছে না। তবে ভর্তি থাকা রোগীদের সেবাদান অব্যাহত রয়েছে।
চিকিৎসাধীন অনেকের শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় এখনই এ হাসপাতাল ছাড়তে চাইছেন না স্বজনদের অনেকেই।
রাজধানীর মধুবাগ এলাকার বাসিন্দা আব্দুল্লাহ বলেন, “গত চার দিন আগে আমার ওয়াইফের সিজার করে বাচ্চা হয়েছে। বাচ্চা এনআইসিইউতে রয়েছে।
“বর্তমানে যে অবস্থা তাতে বাচ্চাকে অন্য জায়গায় স্থানান্তর করা সম্ভব নয়। সরকার যদি অন্য হাসপাতালে বাচ্চাকে সুস্থভাবে নেওয়ার ব্যবস্থা করে, তাহলে নিয়ে যাব। এটির বাইরে বর্তমানে কিছু করার নাই।”
আব্দুল্লাহ বলেন, “হাসপাতালে দুর্ঘটনায় ৬ জন শিশু মারা গেছে; ওই সময়ে যারা দায়িত্বে ছিল, তাদের শাস্তির আওতায় নিয়ে আসা হোক। কিন্তু এভাবে হাসপাতাল বন্ধ করে দিলে অনেকে সেবা থেকে বঞ্চিত হবে।
“এমনকি প্রয়োজনে পুরো হাসপাতালের হায়ার বডি থেকে নার্স পর্যন্ত পরিবর্তন করা হোক, কিন্তু হাসপাতাল বন্ধ নয়।”
ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে আসা সেলিনা বেগম বলেন, “আমার ছোট বাচ্চা হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে। তার শরীরের অবস্থা ভালো নয়। এখন কীভাবে অন্য হাসপাতালে তাকে ভর্তি করাব?
“সরকার এখন হাসপাতাল বন্ধ করে দিলেও আমি হাসপাতাল ছাড়তে চাই না।”
কালিয়াকৈর থেকে আসা আসমা ইসলাম বলেন, “আমার বাচ্চার হামসহ আরো শারীরিক সমস্যা রয়েছে। এই মুহূর্তে অন্য হাসপাতালে যেতে চাই না।
“কারণ এখানের চিকিৎসা ভালো। বাচ্চা সুস্থ হলে চলে যাব, তার আগে কোথাও যেতে চাই না।”
এদিন দুপুরে একটি টিভি স্টেশনের সংবাদকর্মীদের ওপর চড়াও হন হাসপাতাল কর্মীরা। কিছুক্ষণের মধ্যে তারা হাসপাতাল ছেড়ে চলে যান।
ঈদের আগের দিন ২৭ মে সকালে মগবাজারে আদ্-দ্বীন হাসপাতালের পোস্ট ডেলিভারি ওয়ার্ডে ছটফট করতে করতে একে একে ছয় নবজাতক মারা যায়। এ ঘটনায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ‘অবহেলার’ প্রমাণ পাওয়ার কথা বলা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, অতিরিক্ত মানুষের উপস্থিতি; দীর্ঘক্ষণ এসি বন্ধ থাকা এবং বিকল্প কোনো ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা না থাকা; বাতাসে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে যাওয়াই শিশুগুলোর মৃত্যুর সম্ভাব্য কারণ।
এ ঘটনায় দেওয়া হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা ‘সন্তোষজনক না হওয়ায়’ বৃহস্পতিবার লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীদের কী হবে, এমন প্রশ্নের উত্তরে সেদিন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেছিলেন, “যত দ্রুত সম্ভব রোগীদের সরিয়ে ফেলতে হবে। কারণ লাইসেন্স বাতিল হওয়ার পর আর চিকিৎসা দিতে পারবে না ওই হাসপাতাল।”
তবে লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ৩০ দিনের মধ্যে আপিলের সুযোগ রয়েছে বলে জানান তিনি।
জানতে চাইলে আদ দ্বীন ফাউন্ডেশনের পরিচালক তারিকুল ইসলাম মুকুল শুক্রবার গণমাধ্যমকে বলেন, “আমরা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সিদ্ধান্তের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। আগামী রোববারের মধ্যে আমরা আপিল সম্পন্ন করব।”
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “আমরা চাইলেও এত দ্রুত রোগীদের সরিয়ে দিতে পারি না। তাই যথাসাধ্য সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি।
“তবে অনেক রোগী চলে গেছে। এখন আপিলের পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর সবকিছু নির্ভর করছে।”