দীর্ঘ দেড় দশকের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত নতুন গণতান্ত্রিক সরকারের প্রথম জাতীয় বাজেট পেশ করা হয়েছে। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে দেশের মানুষের বিপুল জনম্যান্ডেট নিয়ে জয়ী হয়ে সরকার গঠনের পর ‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রা’ মূল দর্শনকে সামনে রেখে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এই বিশাল ও দূরদর্শী বাজেট প্রস্তাব সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে। বিগত সরকারের রেখে যাওয়া ভঙ্গুর শাসনব্যবস্থা, প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয় এবং লুটপাটের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে দেশের আপামর জনসাধারণের অর্থনৈতিক অধিকার ও সামাজিক সাম্য প্রতিষ্ঠার নতুন দিগন্ত হিসেবে এই বাজেটকে বিবেচনা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে এক জাঁকজমকপূর্ণ এবং জবাবদিহিমূলক পরিবেশে নতুন অর্থবছরের এই বাজেট প্রস্তাবনা পেশ করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। স্পিকারের অনুমতি নিয়ে তিনি যখন তার দীর্ঘ বাজেট বক্তৃতা শুরু করেন, তখন গ্যালারিতে উপস্থিত সংসদ সদস্যসহ দেশবাসীর চোখ ছিল ভঙ্গুর অর্থনীতি টেনে তোলার কাক্সিক্ষত মহাপরিকল্পনার দিকে।
রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিগত আমলের তীব্র অর্থনৈতিক বিপর্যয়, লাগামহীন দুর্নীতি, প্রাতিষ্ঠানিক পচন এবং ব্যাংকসহ বিভিন্ন আর্থিক খাত থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচারের যে ধ্বংসস্তূপ তৈরি হয়েছিল, সেখান থেকে সামষ্টিক অর্থনীতিকে দ্রুত পুনরুদ্ধার করাই এই নতুন বাজেটের প্রধানতম চ্যালেঞ্জ।
একই সঙ্গে বাজারে চলমান দীর্ঘমেয়াদি ও অনিয়ন্ত্রিত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ডলারের বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং দেশের ভেঙে পড়া বাজার ব্যবস্থায় কঠোর শৃঙ্খলা ও সুশাসন ফিরিয়ে আনাই এই বাজেটের মূল লক্ষ্য। বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক তীব্র অস্থিরতা, ইউক্রেন সংকট এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির সামগ্রিক ঝুঁঁকি মাথায় রেখেই অর্থমন্ত্রী অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে আগামী অর্থবছরে দেশের মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার সুনির্দিষ্ট ঘোষণা দিয়েছেন। একইসঙ্গে তিনি দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৬ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার এক সাহসী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছেন। এই সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের পাশাপাশি ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে বিশ্বের বুকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের একটি শক্তিশালী ও টেকসই অর্থনীতিতে পরিণত করার সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ এবং দীর্ঘমেয়াদি রূপরেখা জনগণের সামনে উন্মোচন করেছেন তিনি।
প্রস্তাবিত বিশাল বাজেটের সামগ্রিক ব্যয় কাঠামো ও বরাদ্দ বিশ্লেষণে দেখা যায়, সরকার এবার ঐতিহ্যগত ও গতানুগতিক ধারা থেকে সম্পূর্ণ বেরিয়ে এসে সমাজ গঠন এবং মানবসম্পদ উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে। দেশের যুবসমাজকে বৈশ্বিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা এবং প্রান্তিক মানুষের দোরগোড়ায় সেবার মান পৌঁছানোর লক্ষ্যেই ব্যয়ের এই নতুন দর্শন ঠিক করা হয়েছে। সামগ্রিক ব্যয়ের প্রধান তিনটি খাতের মধ্যে সামাজিক অবকাঠামো খাতে মানবসম্পদকে সবচেয়ে বড় সম্পদ বিবেচনা করে সর্বোচ্চ দুই লাখ ৭৯ হাজার এক কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা মোট ঘোষিত বাজেটের প্রায় ২৯ দশমিক ৭৪ শতাংশ। এই বরাদ্দের বড় অংশই ব্যয় হবে দেশের নাগরিক সুযোগ-সুবিধা, সামাজিক সুরক্ষা এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে। রাষ্ট্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সাধারণ সেবা খাতে দুই লাখ ৪৫ হাজার ১১৭ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা মোট ব্যয়ের ২৬ দশমিক ১৩ শতাংশ। অন্যদিকে, দেশের শিল্পায়ন, জ্বালানি নিরাপত্তা ও যোগাযোগের চাকাকে সচল রাখতে ভৌত অবকাঠামো খাতে এক লাখ ৭৪ হাজার ৯৮৮ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা মোট বরাদ্দের ১৮ দশমিক ৬৬ শতাংশ। এই বরাদ্দের মাধ্যমে দেশের আঞ্চলিক বৈষম্য দূর করার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে।
২৫ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ৬০ হাজার কোটি টাকার তহবিল: প্রস্তাবিত বাজেটে ২৫ লক্ষাধিক নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিল ঘোষণা করা হয়েছে। দেশীয় কৃষি খাত, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প, এসএমই শিল্প এবং রুগ্ন ও বন্ধ কলকারখানাসমূহের জন্য সহজ শর্তে এবং পুনর্ভরণ পদ্ধতিতে ঋণ প্রদানের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিল ২০২৬ ঘোষণা করা হয়েছে। এ প্যাকেজের মধ্যে ৪১ হাজার কোটি টাকা রিফাইন্যান্সিং তহবিল এবং ১৯ হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব তহবিল। এই তহবিলের আওতায় ৫টি প্যাকেজ হলো বন্ধ কলকারখানা চালুকরণ ও সেবা খাতের জন্য ২০ হাজার কোটি টাকা, কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ১০ হাজার কোটি টাকা; সিএমএসএমই খাতে ৫ হাজার কোটি টাকা; রপ্তানি বহুমুখীকরণে ৩ হাজার কোটি টাকা এবং উত্তরবঙ্গকে কৃষি হাব হিসেবে গড়ে তুলতে ৩ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে।
এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ২৫ লক্ষাধিক নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। এই স্কিম হতে উদ্যোক্তাদের চলতি মূলধন সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি উৎপাদন কার্যক্রম সম্প্রসারণে সরকার ৬ শতাংশ সুদ ভর্তুকি দেবে। এর ফলে এ প্যাকেজের আওতায় ঋণ গ্রহণের বিপরীতে উদ্যোক্তাদের প্রকৃত সুদের হার বিদ্যমান বাজার ভিত্তিক সুদ অপেক্ষা অর্ধেকেরও কম হবে, যা শিল্পখাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধি ও বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে সহায়ক হবে। এর বাইরে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবাহ বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখবে।
প্রস্তাবিত ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এই মহাবাজেটে সামগ্রিক ঘাটতির পরিমাণ ধরা হয়েছে দুই লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এই বিশাল অঙ্কের ঘাটতি মেটানোর ক্ষেত্রে বর্তমান সরকার অত্যন্ত পরিপক্ব ও ব্যবসাবান্ধব কৌশলের আশ্রয় নিয়েছে। বিগত আমলের মতো দেশের ব্যাংকিং খাতের ওপর অতিরিক্ত ও অন্ধ চাপ সৃষ্টি করে তীব্র তারল্য সংকট তৈরি না করে, সরকার এবার সহজ শর্তে বৈদেশিক উৎসের ওপর অনেক বেশি জোর দিয়েছে। বাজেটের হিসাব অনুযায়ী, মোট ঘাটতির মধ্যে এক লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা সংস্থান করা হবে বিভিন্ন বৈদেশিক উৎস এবং সহজ শর্তের আন্তর্জাতিক ঋণ থেকে। অন্যদিকে, বাকি এক লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে মেটানো হবে। তবে এই অভ্যন্তরীণ উৎসের মধ্যেও একটি বড় ইতিবাচক পরিবর্তন আনা হয়েছে। অভ্যন্তরীণ খাত থেকে ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকিং খাত থেকে নেওয়া হবে এক লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা, যা বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় ছয় হাজার কোটি টাকা কম।
অর্থ বিশেষজ্ঞরা সরকারের এই সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়ে বলেছেন, ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার পরিমাণ কমানোর ফলে দেশের বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবাহ সচল ও গতিশীল থাকবে, যার ফলে স্থানীয় উদ্যোক্তারা সহজে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে নতুন নতুন শিল্পকারখানা স্থাপন ও ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারবেন।
নতুন বাংলাদেশের প্রধান চালিকাশক্তি যুবসমাজ ও ছাত্র-জনতার নতুন আকাঙক্ষাকে ধারণ করে শিক্ষাখাত পুনর্গঠনে আগামী অর্থবছরে বরাদ্দ একলাফে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা বাড়ানো হয়েছে। এই খাতে মোট এক লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা দেশের মোট জিডিপির দুই শতাংশের সমান এবং এটি শিক্ষা বাজেটের ইতিহাসে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক। এই খাতের প্রধান চমক ও বৈপ্লবিক পরিবর্তনের মধ্যে রয়েছে দেশের জাতীয় শিক্ষাক্রমে বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ যেকোনো একটি তৃতীয় ভাষা শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা। বৈশ্বিক শ্রমবাজারের বৈচিত্র্যকে ধরার লক্ষ্যেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, এই তৃতীয় ভাষাজ্ঞানসম্পন্ন শিক্ষার্থীরা যদি পরবর্তী সময়ে উচ্চশিক্ষার জন্য সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে যেতে চায়, তবে তাদের আর্থিক সংকট দূর করতে সরকার ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত অত্যন্ত সহজ শর্তে উচ্চশিক্ষা ঋণ সুবিধা প্রদান করবে।
এছাড়া দেশের নারী শিক্ষার অভূতপূর্ব প্রসারে এবং উচ্চশিক্ষায় মেয়েদের অংশগ্রহণ বাড়াতে ছাত্রীদের জন্য স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে করার ঐতিহাসিক ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। একই সাথে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের স্কুলগুলোতে সম্পূর্ণ প্রযুক্তিভিত্তিক ও ডিজিটাল শিক্ষার আলো পৌঁছে দিতে বিশেষ কর্মসূচি চালু এবং শিক্ষার্থীদের পুষ্টির ঘাটতি দূর করতে দেশব্যাপী মানসম্মত মিড-ডে সবধষ বা দুপুরের খাবার চালুর যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বিগত আমলের ভঙ্গুর, দুর্নীতিগ্রস্ত ও সিন্ডিকেটনির্ভর স্বাস্থ্য খাতকে আমূল ঢেলে সাজাতে এবং সাধারণ মানুষের চিকিৎসার জন্য পকেটের খরচ বা চিকিৎসা ব্যয় কমাতে এবার এই খাতের বরাদ্দ প্রায় দ্বিগুণ করা হয়েছে। আগামী অর্থবছরের জন্য স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ খাতে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। তৃণমূল তথা প্রত্যান্ত অঞ্চলের মানুষের দোরগোড়ায় মানসম্মত আধুনিক চিকিৎসা সেবা পৌঁছে দিতে দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে এবং বিভাগীয় বা জেলা শহরের প্রতিটি ওয়ার্ডে অত্যাধুনিক প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট বা সর্বাধুনিক কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন করা হবে। সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার আওতায় দেশের প্রতিটি নাগরিককে ডিজিটাল স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সাথে যুক্ত করতে একটি করে আধুনিক ইলেকট্রনিক হেলথ কার্ড দেওয়া হবে, যার মাধ্যমে যেকোনো হাসপাতালে রোগীর পূর্ববর্তী সব প্রেসক্রিপশন ও চিকিৎসার ইতিহাস মুহূর্তে দেখে দ্রুত চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হবে। এছাড়া স্বাস্থ্যখাতের দীর্ঘদিনের জনবল ও চিকিৎসকের তীব্র শূন্যপদ দূর করতে অবিলম্বে পাঁচ হাজার নতুন এমবিবিএস ডাক্তার এবং দেশব্যাপী আরও এক লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী সরাসরি নিয়োগের ঐতিহাসিক ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। নারীর ক্ষমতায়ন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির লক্ষ্যে এই বিশাল নিয়োগের মোট ৮০ শতাংশ পদই নারীদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে বলে অর্থমন্ত্রী নিশ্চিত করেছেন।
নতুন বাজেটে দেশের রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি, চোরাচালান রোধ এবং জনগণের বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে তামাকজাত পণ্যের ওপর সম্পূরক শুল্ক ও সর্বনিম্ন খুচরা মূল্য উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করার সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব আনা হয়েছে। সরকারের এই কঠোর পদক্ষেপের ফলে এখন থেকে বাজারে সিগারেটের সর্বনিম্ন স্তরের প্রতি ১০ শলাকার মূল্য দাঁড়িয়েছে ৬২ টাকা এবং অতি উচ্চ বা প্রিমিয়াম স্তরের প্রতি ১০ শলাকার মূল্য ২১০ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া তরুণ সমাজকে ক্ষতিকর আধুনিক ও বিকল্প নেশা থেকে দূরে রাখতে নিকোটিন পাউচের ওপর ৪০ শতাংশ এবং হিটেড টোব্যাকো পণ্যের ওপর ৬৭ শতাংশ পর্যন্ত উচ্চ হারে সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। পাশাপাশি দেশের ভেতরে কর বা ভ্যাটের আওতা আমূল বাড়াতে এবং কর ফাঁকি সম্পূর্ণ বন্ধ করতে এখন থেকে যেকোনো ধরনের ব্যবসায়িক বা বাণিজ্যিক ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার ক্ষেত্রে সরকারের ভ্যাট নিবন্ধন গ্রহণ করা আইনিভাবে বাধ্যতামূলক করার জন্য আয়কর ও ভ্যাট আইনে প্রয়োজনীয় কড়াকড়ি ও সংশোধনীর প্রস্তাব আনা হয়েছে। একই সাথে দেশের উচ্চবিত্তের ব্যবহার্য উচ্চ মূল্যের আমদানিকৃত হিমায়িত মাছ এবং সুগন্ধি বৃক্ষ নির্যাসের ওপর আমদানি পর্যায়ে নতুন করে ১৫ শতাংশ মূসক বা ভ্যাট আরোপের প্রস্তাবও করা হয়েছে। তবে সাধারণ ও মধ্যবিত্ত নগরবাসীর যাতায়াতের কথা বিবেচনা করে এবং পরিবেশবান্ধব গণপরিবহনকে উৎসাহিত করতে মেট্রোরেল সেবার ওপর চলমান ভ্যাট অব্যাহতির মেয়াদ আগামী ২০২৮ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত অর্থাৎ আরও দুই বছর বৃদ্ধি করা হয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা এবং দেশের মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবারের বাজেটে কৃষি ও কৃষকবান্ধব নীতিকে বড় আকারে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। কৃষি খাতের আধুনিকীকরণ, যান্ত্রিকীকরণ এবং প্রান্তিক চাষিদের ভর্তুকির টাকা সরাসরি তাদের অ্যাকাউন্টে পৌঁছে দেওয়ার জন্য একটি স্বচ্ছ ও আধুনিক ডিজিটাল মেকানিজম গড়ে তোলার প্রস্তাব করা হয়েছে। বাজেট বক্তৃতায় জানানো হয়, সার, উন্নত জাতের বীজ, কীটনাশক এবং সেচ কাজের জন্য বিদ্যুৎ বিলে যে ভর্তুকি দেওয়া হতো, তার পরিমাণ এবার উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো হয়েছে। বিশেষ করে বন্যা, খরা ও লবণাক্ততা সহিষ্ণু শস্যের জাত উদ্ভাবনের জন্য কৃষি গবেষণা খাতে বিশেষ তহবিল গঠন করা হয়েছে। প্রান্তিক চাষিদের সহজ শর্তে ও নামমাত্র সুদে কৃষি ঋণ দেওয়ার জন্য বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে, যাতে তারা দাদন ব্যবসায়ী বা চড়া সুদের ক্ষুদ্রঋণের ফাঁদ থেকে রক্ষা পেতে পারেন।
বিগত সরকারের আমলের তীব্র বিদ্যুৎ সংকট, লোডশেডিং এবং ক্যাপাসিটি চার্জের নামে হাজার হাজার কোটি টাকার লুণ্ঠন বন্ধ করতে এবারের বাজেটে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে এক বৈপ্লবিক সংস্কারের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। অর্থমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, কোনো প্রকার উৎপাদন ছাড়াই বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোকে বসিয়ে রেখে জনগণের টাকা অপচয় করার যে ক্যাপাসিটি চার্জ নীতি ছিল, তা সম্পূর্ণ বাতিল করা হচ্ছে। এর পরিবর্তে বাজেটে জোর দেওয়া হয়েছে সাশ্রয়ী মূল্যে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং পরিবেশবান্ধব নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর। সৌর বিদ্যুৎ, বায়ু বিদ্যুৎ এবং বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রকল্পগুলোতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে শুল্ক ছাড়ের বড় ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। একই সাথে দেশের অভ্যন্তরীণ গ্যাস ও খনিজ সম্পদ অনুসন্ধানে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে বিশেষ টেকনিক্যাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে আমদানিকৃত এলএনজির ওপর দেশের বিপজ্জনক নির্ভরতা কমিয়ে আনবে।
উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও বাজার সিন্ডিকেটের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত নিম্নবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে সরাসরি রাষ্ট্রীয় সহায়তা দিতে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিধি ও ভাতার পরিমাণ একলাফে অনেকখানি বাড়ানো হয়েছে। বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা এবং অসচ্ছল প্রতিবন্ধী ভাতার পরিমাণ মাসিক ভিত্তিতে বৃদ্ধির পাশাপাশি উপকারভোগীর সংখ্যা আরও কয়েক লাখ বাড়ানো হয়েছে। শহরাঞ্চলের প্রান্তিক ও বস্তিবাসী মানুষের জন্য ওএমএস এবং টিসিবির মাধ্যমে কার্ডের ভিত্তিতে অত্যন্ত সুলভ মূল্যে চাল, ডাল, তেল ও চিনি বিতরণের পরিধি দ্বিগুণ করার জন্য বাজেটে বিশেষ অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এছাড়া গ্রামীণ এলাকায় কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে বিশেষ কর্মসৃজন প্রকল্প পুনরায় চালু করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, যা বর্ষা ও মন্দা মৌসুমে গ্রামীণ মজুরদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী রাখবে। একই সাথে দেশের নদী ভাঙনকবলিত ও দুর্যোগপ্রবণ অঞ্চলের সুরক্ষায় পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা খাতে ১০ হাজার ৫৩৩ কোটি টাকা এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ খাতে ১০ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া সমাজে বৈষম্য দূরীকরণ ও প্রান্তিক নারীদের স্বাবলম্বী করতে নারী ও শিশু উন্নয়ন খাতে বিশেষ পাঁচ হাজার ১৯৬ কোটি টাকার সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তিতে বড় ভূমিকা রাখবে।
দীর্ঘ সময় ধরে চলা বাজেট বক্তৃতার শেষ অংশে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আবেগাপ্লুত কণ্ঠে দেশের সর্বস্তরের মেহনতি ও পেশাজীবী মানুষের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে ও আশাবাদ ব্যক্ত করে বললেন, প্রস্তাবিত এই মহাবাজেট কেবল সরকারের গতানুগতিক বার্ষিক আয়-ব্যয়ের কোনো কাগুজে হিসাব বা সংখ্যার কসরত নয়, বরং এটি দেশের মেহনতি ও শ্রমজীবী মানুষের কষ্টার্জিত ট্যাক্সের অর্থের সঠিক ব্যবহার ও সুশাসন নিশ্চিত করার একটি পবিত্র রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার। এটি আগামী দিনে একটি প্রকৃত কল্যাণমুখী, গণতান্ত্রিক, জনগণের কাছে সম্পূর্ণ জবাবদিহিমূলক, মানবিক এবং বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশ গড়ে তোলার এক অত্যন্ত মজবুত ও অবিচল ভিত্তিপ্রস্তর।