বর্তমান যুগে তথ্যপ্রযুক্তির অভাবনীয় অগ্রগতির ফলে মানুষের জীবনযাত্রায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। দূরপ্রবাসে থাকা বা ভিন্ন দেশে অবস্থান করা প্রিয়জনের সাথে যোগাযোগ এখন চোখের পলকেই সম্ভব। এই প্রযুক্তির হাওয়া লেগেছে সামাজিক ও পারিবারিক বন্ধনগুলোতেও। আজকাল প্রায়ই শোনা যায়—বর বা কনের কেউ একজন প্রবাসে বা দূরে থাকায় ভিডিও কল, অডিও কল কিংবা ফেসবুক-হোয়াটসঅ্যাপের মেসেজের মাধ্যমে বিয়ে সম্পন্ন করছেন।
অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে—এভাবে দূর থেকে ভিডিও কলে বা মেসেজে ‘কবুল’ বললে কি ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী বিয়ে বৈধ হবে? দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেম সমাজ এবং ফিকহ একাডেমিগুলোর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এর সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা নিচে তুলে ধরা হলো:
ইসলামে বিয়ের মূল শর্তসমূহ (এক নজরে)
ডিজিটাল মাধ্যমের বিয়ের শুদ্ধতা বোঝার আগে ইসলামে একটি বৈধ বিয়ের মূল শর্তগুলো জানা জরুরি:
১. ইজাব ও কবুল (প্রস্তাব ও গ্রহণ): এক পক্ষ থেকে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া এবং অপর পক্ষ থেকে তা গ্রহণ করা।
২. অনুমতি বা অভিভাবক (ওয়ালি): কনের অভিভাবকের সম্মতি ও উপস্থিতি।
৩. দেনমোহর নির্ধারণ: কনের ন্যায্য দেনমোহর ধার্য করা।
৪. সাক্ষী (গুরুত্বপূর্ণ শর্ত): বিয়ের মজলিসে অন্তত দুজন প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন মুসলিম পুরুষ অথবা একজন পুরুষ ও দুজন নারী সাক্ষী সশরীরে উপস্থিত থাকা।
৫. একই মজলিস (ইত্তিহাদুল মজলিস): ইজাব (প্রস্তাব) এবং কবুল (গ্রহণ) একই বৈঠকে বা মজলিসে হতে হবে।
১. ভিডিও কলে সরাসরি ‘কবুল’ বললে কি বিয়ে হবে?
ভিডিও কলে বর-কনে একে অপরকে সরাসরি দেখতে পান এবং কথা শুনতে পান। তবে ইসলামি ফিকহ বা আইন অনুযায়ী, কেবল ভিডিও কলে বর-কনে একে অপরকে দেখে ‘কবুল’ বললেই বিয়ে শুদ্ধ হবে না, যদি না সাক্ষীদের শর্ত পূরণ হয়।
সঠিক ও বৈধ পদ্ধতি (উকিল নিয়োগ):
যদি বর বা কনের কেউ একজন দূরে বা প্রবাসে থাকেন, তবে দূর থেকে সরাসরি ভিডিও কলে ইজাব-কবুল না করে সবচেয়ে নিরাপদ ও সর্বসম্মত পদ্ধতি হলো ‘উকিল’ বা প্রতিনিধি নিয়োগ করা।
কীভাবে করবেন: প্রবাসে থাকা বর (বা কনে) ভিডিও কলে বা অন্য কোনো মাধ্যমে বাংলাদেশে থাকা বিশ্বস্ত কোনো ব্যক্তিকে তাঁর পক্ষে বিয়ে সম্পন্ন করার জন্য ‘উকিল’ বা প্রতিনিধি নিযুক্ত করবেন। এই উকিল নিয়োগের সময়ও দুজন সাক্ষী থাকা ভালো।
এরপর বিয়ের মূল মজলিসে (যেখানে কনে ও সাক্ষীরা সশরীরে উপস্থিত আছেন) সেই নিযুক্ত উকিল বরের পক্ষ হয়ে বলবেন, “আমি বরের অমুক প্রতিনিধি হিসেবে এত টাকা দেনমোহরে আপনাকে বরের সাথে বিয়ে দিচ্ছি।” কনে তখন সাক্ষীদের উপস্থিতিতে ‘কবুল’ বলবেন। এভাবে বিয়ে করলে তা শতভাগ বৈধ হবে।
সরাসরি ভিডিও কলে বিয়ের আধুনিক ফতোয়া: কিছু আধুনিক ফকিহ বা গবেষক শর্ত সাপেক্ষে সরাসরি ভিডিও কলে বিয়ে বৈধ বলেছেন, তবে তা অত্যন্ত জটিল। শর্ত হলো—যেখানে কনে বসে ‘কবুল’ বলছেন, সেখানে দুজন যোগ্য সাক্ষীকে সশরীরে উপস্থিত থাকতে হবে এবং বরের কণ্ঠ ও ভিডিও যে আসল (কোনো এআই বা এডিটিং প্রযুক্তির কারসাজি নয়) তা সাক্ষীদের নিশ্চিত হতে হবে। তবে ওলামায়ে কেরামের মতে, ফেতনা ও জালিয়াতি এড়াতে ‘উকিল নিয়োগ’ করাই সবচেয়ে উত্তম ও নিরাপদ পদ্ধতি।
২. মেসেজ বা টেক্সট পাঠিয়ে ‘কবুল’ বললে কি বিয়ে হবে?
ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ বা ইমেইলে মেসেজ পাঠিয়ে—“আমি তোমাকে বিয়ে করলাম” আর অপর পক্ষ থেকে ফিরতি মেসেজে “কবুল করলাম” লিখলে ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী কোনোভাবেই বিয়ে সম্পন্ন হবে না। এটি সম্পূর্ণ অবৈধ ও বাতিল।
কারণ:
ইসলামি শরিয়তের বিধান হলো, বিয়ের প্রস্তাব ও গ্রহণ মুখে উচ্চারিত শব্দের মাধ্যমে হতে হবে এবং সেই শব্দ বা আওয়াজ একই মজলিসে উপস্থিত সাক্ষীদের কান পর্যন্ত সরাসরি পৌঁছাতে হবে। মেসেজ বা টেক্সট আদান-প্রদানে সাক্ষীদের সশরীরে আওয়াজ শোনার কোনো সুযোগ থাকে না। তাই মেসেজে ইজাব-কবুল বললে বিয়ে হবে না।
৩. অডিও কলে ‘কবুল’ বললে কি বিয়ে হবে?
ভিডিও কলের মতো অডিও কলেও সরাসরি ইজাব-কবুল করা থেকে বিরত থাকা উচিত। কারণ কেবল কণ্ঠ শুনে অনেক সময় বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে এবং জালিয়াতির সুযোগ থাকে। এক্ষেত্রেও প্রবাসে থাকা ব্যক্তিটি বাংলাদেশে তাঁর কোনো আত্মীয় বা বন্ধুকে ‘উকিল’ বানিয়ে দেবেন এবং সেই উকিল মূল মজলিসে সাক্ষীদের সামনে বিয়ে সম্পন্ন করবেন।
সারসংক্ষেপ ও পরামর্শ:
ডিজিটাল যুগে দূর প্রবাসে থেকে বিয়ে করার ক্ষেত্রে কোনো লুকোচুরি বা শর্টকাট (যেমন—সরাসরি মেসেজ বা হুট করে ভিডিও কল) অবলম্বন করা উচিত নয়। দাম্পত্য জীবন একটি পবিত্র ও আইনি বন্ধন। তাই দূর থেকে বিয়ে করতে চাইলে:
১. বর বা কনে যেকোনো এক পক্ষ অন্য পক্ষে একজন ‘উকিল’ বা প্রতিনিধি নিযুক্ত করুন।
২. বিয়ের মূল মজলিসে কনে, উকিল, কাজি এবং ন্যূনতম দুজন পুরুষ সাক্ষী সশরীরে এক স্থানে উপস্থিত হোন।
৩. উকিলের মাধ্যমে ইজাব-কবুল সম্পন্ন করুন। প্রয়োজনে দূর থেকে বর বা পরিবারের অন্য সদস্যরা ভিডিও কলে যুক্ত থেকে পুরো আয়োজনটি সরাসরি উপভোগ করতে পারেন।
ইসলাম একটি সহজ ও বাস্তবসম্মত জীবনব্যবস্থা। প্রবাসীদের সুবিধার্থে ‘উকিল নিয়োগ’-এর যে সুন্দর আইনি পথ ইসলামে রাখা হয়েছে, তা অনুসরণ করাই ঈমানের দাবি এবং এর মাধ্যমেই একটি বিয়ে সামাজিকভাবে ও ধর্মীয়ভাবে পূর্ণ বৈধতা পায়।