অনুপ্রবেশকারীর তকমা দিয়ে মানুষজনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া নিয়ে ভারত সীমান্তে যেসব সমস্যা তৈরি হয়েছে, সেগুলো ‘দ্রুত’ সমাধান হয়ে যাবে বলে মনে করছেন দীনেশ ত্রিবেদী। বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের কাছে পরিচয়পত্র পেশ করতে গিয়ে এ আশার কথা শোনান ঢাকায় ভারতের নতুন এই হাই কমিশনার।
এদিন ঢাকা মিশনে আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু করেন রাজনীতিক থেকে কূটনীতিক বনে যাওয়া ত্রিবেদী।
রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতায় পরিচয়পত্র পেশের পর সাহাবুদ্দিনের সঙ্গে হাই কমিশনারের সৌজন্য বৈঠক হওয়ার তথ্য দিয়েছেন রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব মো. সরওয়ার আলম।
বৈঠকে আলোচনার বিষয়বস্তু তুলে ধরে তিনি বলেন, দুই দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং সীমান্ত সমস্যাসহ অমীমাংসিত ইস্যু সমাধানে ইতিবাচক উদ্যোগের উপর রাষ্ট্রপতি গুরুত্বারোপ করেন।
সীমান্ত সমস্যা সম্পর্কে হাইকমিশনার বলেন যে, সম্প্রতি বিএসএফ ও বিজিবির উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। তিনি দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী ও কর্মকর্তাদের মধ্যে স্থানীয় ও উচ্চ পর্যায়ে এ ধরনের বৈঠক আরও নিয়মিত আয়োজনের উপর গুরুত্বারোপ করে সীমান্ত সমস্যা দ্রুত সমাধান হবে বলে আশা প্রকাশ করেন।
রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব বলেন, নবনিযুক্ত ভারতীয় হাই কমিশনারকে স্বাগত জানিয়ে সাহাবুদ্দিন আশা প্রকাশ করেন যে, তার কর্মকাল বাংলাদেশ-ভারত পারস্পরিক সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ়, ফলপ্রসূ ও জনকল্যাণমুখী করতে সহায়ক হবে।
প্রেস সচিব বলেন, বাংলাদেশের নতুন সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার অংশগ্রহণের কথা ‘কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন’।
রাষ্ট্রপতিকে উদ্ধৃত করে সরওয়ার আলম বলেন, নিকটতম প্রতিবেশী এবং গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য ও উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে বাংলাদেশ বিশেষ গুরুত্ব দেয়।
রাষ্ট্রপতি বলেন, সার্বভৌম সমতা, জাতীয় স্বার্থ ও মর্যাদা এবং জনগণের কল্যাণকে সমুন্নত রেখে ভারতের সঙ্গে সম্মানজনক ও ভবিষ্যতমুখী অংশীদারত্ব বজায় রাখতে বাংলাদেশ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
এ প্রসঙ্গে হাইকমিশনার বলেন, আমাদের দুটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ ও সৌহার্দময় সম্পর্ক বিদ্যমান, আর এটাই স্বাভাবিক।
দীনেশ ত্রিবেদী ভারতের রাষ্ট্রপতির ও নেতৃত্বের শুভেচ্ছা রাষ্ট্রপতির কাছে পৌঁছে দেন এবং দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা আরও জোরদারে ভারতের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন বলে সরওয়ার আলম জানান।
রাষ্ট্রপতি হাই কমিশনারের মাধ্যমে ভারতের রাষ্ট্রপতির প্রতি শুভেচ্ছা জানান। হাই কমিশনার বাংলাদেশে তার দায়িত্ব পালনে রাষ্ট্রপতি ও বাংলাদেশের জনগণের সার্বিক সহযোগিতা কামনা করেন।
এ সময় রাষ্ট্রপতি তার সফল মেয়াদ কামনা করেন এবং দুই দেশের সম্পর্ক আরও সৌহার্দপূর্ণ ও সুসংহত করতে পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দেন বলে বঙ্গভবনের তরফে বলা হয়।
চব্বিশের অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে, তা ঘোচানোর জন্য পোড় খাওয়া রাজনীতিক দীনেশ ত্রিবেদীকে রাষ্ট্রদূত করে বাংলাদেশে পাঠিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইন্ডিয়ান ফরেন সার্ভিসের সেরা কর্মকর্তাদের ঢাকা মিশনে পদায়নের যে ধারা, সেখান থেকে সরে এসে সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও পশ্চিমবঙ্গের প্রভাবশালী এই রাজনীতিককে পাঠানো ‘কূটনীতির সুর ও পদ্ধতির ক্ষেত্রে নতুন বিন্যাসের ইঙ্গিত দেয়’।
পশ্চিমবঙ্গের ব্যারাকপুরের সাবেক এমপি ও বিজেপি নেতা ত্রিবেদীকে মন্ত্রীর মর্যাদা দিয়ে বুধবার অফিস আদেশ জারি করেছে ভারত সরকার। এই মর্যাদা শুধু আনুষ্ঠানিক বা প্রটোকল-সংশ্লিষ্ট আয়োজনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।
দীনেশ ত্রিবেদী বাংলা বলতে পারেন এবং দুই বাংলার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সম্পর্কেও ভালো ধারণা রাখেন। সেতারবাদক হিসেবেও তার পরিচিতি রয়েছে।
গুজরাটি দম্পতি হীরালাল ত্রিবেদী এবং উর্মিলাবেন ত্রিবেদীর ছোট ছেলে দীনেশ ত্রিবেদী হিমাচল প্রদেশের বোর্ডিং স্কুল থেকে পড়াশোনার পর কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে কমার্সে স্নাতক ডিগ্রি পান। তারপর টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ে এমবিএ করেন।
প্রবীণ এই রাজনীতিক দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। আশির দশকে ছিলেন কংগ্রেস নেতা। পরে ১৯৯০ সালে জনতা দলে চলে যান।
১৯৯০-৯৬ পর্যন্ত তিনি রাজ্যসভায় জনতা দলের সদস্য ছিলেন। ১৯৯৮ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তৃণমূল কংগ্রেস গঠন করলে সেই দলে যোগ দেন দীনেশ ত্রিবেদী। তিনিই দলটির প্রথম সাধারণ সম্পাদক।
২০০২-০৮ পর্যন্ত রাজ্যসভায় তৃণমূলের এমপি ছিলেন দীনেশ। ২০০৯ সালে ব্যারাকপুর থেকে তৃণমূলের হয়ে লোকসভা ভোটে প্রার্থী হন। ওই আসনে জিতে কেন্দ্রের মনমোহন সিংহ সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী হন।
২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে জয়ের পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রেলমন্ত্রীর দায়িত্ব ছেড়ে দিলে সেই দায়িত্ব সামলান দীনেশ। পরে তাকে সেই দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
২০১৯ সালের নির্বাচনে ব্যারাকপুর থেকে আবারও তৃণমূলের প্রার্থী হয়েছিলেন দীনেশ, কিন্তু সেবার বিজেপির অর্জুন সিংয়ের কাছে হেরে যান। তারপর তৃণমূল তাকে আবার রাজ্যসভায় পাঠায়।
কিছুদিন পর তৃণমূলের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয় দীনেশের। এর ধারাবাহিকতায় ২০২১ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি তিনি তৃণমূল থেকে পদত্যাগ করেন এবং ৬ মার্চ বিজেপিতে যোগ দেন।
বৃহস্পতিবার পরিচয়পত্র পেশের পরপরই ঢাকার যমুনা ফিউচার পার্কে ভারতীয় ভিসা আবেদন কেন্দ্র (আইভ্যাক) পরিদর্শনে গিয়ে প্রায় দুই বছর বন্ধ থাকা পর্যটন ভিসা চালুর ঘোষণা দেন নতুন হাই কমিশনার।