ভেনেজুয়েলার ভয়াবহ ভূমিকম্পের ধ্বংসস্তূপ থেকে নিজের ১৮ দিন বয়সী নবজাতকসহ অলৌকিকভাবে জীবিত উদ্ধার হওয়া এক মা শুনিয়েছেন তার বেঁচে থাকার রুদ্ধশ্বাস গল্প। বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ডায়ানা পাতিনো নামের ওই মা জানান, তার কোলে থাকা ছোট্ট ছেলেসন্তান হুয়ান দাভিদ-ই তাকে অন্ধকারের মধ্যে জেগে থাকার ও বেঁচে থাকার শক্তি জুগিয়েছে।
ডায়ানা বলেন, যতক্ষণ আমার ছেলে বেঁচে ছিল, ততক্ষণ আমিও বেঁচে থাকার প্রেরণা পাচ্ছিলাম। সে তখনও শ্বাস নিচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত হতে আমি বারবার ওর নাকে হাত দিয়ে দেখছিলাম।
মা ও শিশুর এই অলৌকিক উদ্ধারের ভিডিওটি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে।
আট তলা থেকে অতল গহ্বরে: অন্ধকারের সেই ভয়ংকর ঘণ্টাগুলো
রোববার (২৮ জুন) ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসের একটি ক্লিনিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ডায়ানা মাটির নিচে কাটানো সেই আতঙ্কজনক মুহূর্তগুলোর বর্ণনা দেন, যেখানে তিনি তার ছোট্ট শিশুকে বুকে জড়িয়ে ধরে শুধু অলৌকিক কিছুর জন্য প্রার্থনা করছিলেন। উত্তর উপকূলীয় অঞ্চল লা গুয়াইরাতে অবস্থিত নিজেদের আট তলার অ্যাপার্টমেন্টে যখন ভূমিকম্প আঘাত হানে, তখন ডায়ানা থালাবাসন ধোয়ার কাজ করছিলেন। এটিকে সাধারণ মৃদু কম্পন ভেবে তিনি দ্রুত তার ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরেন।
ভয়াবহ সেই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে ডায়ানা বলেন, আমার মনে হচ্ছিল আমি বাতাসে উড়ছি। এরপর মনে হলো আমি পানি আর মাটির গভীরে তলিয়ে যাচ্ছি ও শেষমেষ একটা গভীর গর্তের মধ্যে গিয়ে পড়লাম। অত ওপর থেকে পড়ার পরও আমি কীভাবে যে আমার বাচ্চাকে হাত থেকে ছেড়ে দিইনি, তা আমি নিজেও জানি না। নিচে পড়ার সময় আমি আসবাবপত্রের সাথে প্রচণ্ডভাবে ধাক্কা খেয়েছিলাম।
আটকে পড়ার পরপরই তিনি চিৎকার করা শুরু করেন, কিন্তু দ্রুতই বুঝতে পারেন যে বাইরে থেকে কেউ তার আওয়াজ শুনতে পাচ্ছে না। ডায়ানা বলেন, আমি নিজেকে বললাম, শুধু শুধু শক্তি নষ্ট করবো না। যখন কাছাকাছি কারও গলার আওয়াজ বা হাঁটার শব্দ পাবো, ঠিক তখনই চিৎকার করবো।
তিনি আরও বলেন, আমি কীভাবে যে এতটা শান্ত ছিলাম জানি না, কারণ আমার বাম পা কংক্রিটের নিচে চাপা পড়েছিল। আমি নড়াচড়া করতে পারছিলাম না ও আমার কপালের একপাশ একটা পাথরের সাথে চেপে ধরে ছিল।
যেভাবে ফিরলো জীবনের আশা
চরম অন্ধকারের মধ্যে নিজের শরীরের নিচে একটি বাইবেল অনুভব করার পর ডায়ানা প্রথম আশার আলো দেখতে পান। তিনি বলেন, সেখান থেকেই মূলত আমার বেঁচে থাকার লড়াই শুরু হয়। ধ্বংসস্তূপের অভেদ্য অন্ধকারের মাঝে তিনি সামান্য একটু আলোর বিন্দু দেখতে পান, যা দেখতে অনেকটা চাঁদের মতো লাগছিল।
অবশেষে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ আসে, যখন তিনি তার ভাইয়ের গলার আওয়াজ পান, যিনি বাইরে থেকে তার নাম ধরে ডাকছিলেন। ডায়ানা বলেন, আমি নিজেকে বললাম, এটাই আমার একমাত্র সুযোগ। আমি আমার গলার সবটুকু জোর দিয়ে চিৎকার করে বললাম, আমি এখানে। ওপাশ থেকে আমার ভাই বললো, আমি তোমাকে খুঁজে পেয়েছি ও আমি কথা দিচ্ছি, তোমাকে বের না করা পর্যন্ত এখান থেকে এক পা-ও নড়বো না।
ভাই তার সেই কথা রেখেছিলেন। অত্যন্ত সতর্ক ও জটিল এক উদ্ধার অভিযানের পর বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) রাতে মা ও শিশুকে ধ্বংসস্তূপ থেকে বের করে আনা সম্ভব হয়। ভূমিকম্পের আঘাতে ডায়ানার দুই পায়েই বেশ চোট লেগেছে, তবে সৌভাগ্যবশত তার শিশু হুয়ান সামান্য আঘাত পেয়েছে।
স্বামীর চোখে এটি এক ‘অলৌকিক ঘটনা’
ডায়ানার স্বামী গেরসন পাটিনো ভূমিকম্পের ঠিক আগমুহূর্তে গাড়ি পার্ক করে বাসায় ফিরেছিলেন। কম্পন শুরু হতেই তিনি একটি বেড়া টপকে নিরাপদ স্থানে সরে যেতে সক্ষম হন। কিন্তু পরে যখন নিজের অ্যাপার্টমেন্ট ভবনটির ধ্বংসস্তূপ দেখেন, তখন তিনি ধরে নিয়েছিলেন যে তার স্ত্রী ও সন্তান আর বেঁচে নেই।
বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া সেই ভিডিওতে দেখা যায়, সন্তানকে কোলে পেয়ে গেরসন আবেগে চোখ বন্ধ করে আকাশের দিকে মুখ তুলে দাঁড়িয়ে আছেন। সেই মুহূর্তটিকে একটি ‘মিরাকল’ বা অলৌকিক ঘটনা উল্লেখ করে গেরসন বিবিসিকে বলেন, সেই অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। আমি ভেবেছিলাম ওরা মারা গেছে। যখন আমার ছেলেকে জীবিত দেখলাম, মনে হল আমার নিজেরই নতুন জন্ম হয়েছে। আমি বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না, মনে হচ্ছিল আমার ভেতরে জীবন ফিরে এসেছে।
ভূমিকম্পে গেরসন ও ডায়ানার ঘরবাড়িসহ সব আসবাবপত্র পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে এবং তাদের পোষা কুকুরটি এখনো নিখোঁজ থাকায় তারা ভীষণ মর্মাহত। তবে জীবনের এই নতুন স্পন্দন নিয়ে তারা আবার নতুন করে সবকিছু শুরু করতে চান। গেরসন বলেন, আমরা আমাদের প্রায় সবকিছুই হারিয়েছি, কিন্তু আমরা তো বেঁচে আছি। যা হারিয়েছি, তা আবার নতুন করে গড়ে তুলবো।
বুধবারে (২৩ জুন) আঘাত হানা এই জোড়া ভূমিকম্পে দেশটিতে নিহতের সংখ্যা বেড়ে এখন অন্তত ১ হাজার ৪৫০ জনে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া আরও দশ হাজারেরও বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন, যাকে দেশটির ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ভেনিজুয়েলার ইতিহাসের ‘সবচেয়ে নির্মম প্রাকৃতিক বিপর্যয়’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। ধ্বংসস্তূপে এখনো তল্লাশি চালানো হলেও আর কাউকে জীবিত পাওয়ার আশা ক্রমান্বয়ে ক্ষীণ হয়ে আসছে।
সূত্র: বিবিসি