*স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করেছে ইসি: মির্জা ফখরুল
*স্থানীয় নির্বাচন মূলত জনসম্পৃক্ততার ওপর নির্ভর করে: ইকবাল হাসান মাহমুদ
*ত্যাগ ও অবদানই হবে মূল বিচার্য: নজরুল ইসলাম খান
*জনপ্রিয় ও ত্যাগীদেরই মূল্যায়ন করা হবে: রিজভী
*রাজপথে সক্রিয় ভূমিকা রাখারাই অগ্রাধিকার পাবেন: জয়নুল আবদিন ফরুক
সবকিছু ঠিক থাকলে চলতি বছরের বর্ষা মৌসুমের পর, অর্থাৎ আগামী সেপ্টেম্বর বা অক্টোবর মাস থেকে পর্যায়ক্রমে স্থানীয় সরকার নির্বাচনী উৎসব শুরু হতে যাচ্ছে। এ নির্বাচনে দলীয় কোনো প্রতীক থাকছে না। তবে একক প্রার্থী দেওয়ার ক্ষেত্রে দলীয় ইঙ্গিত থাকছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। বিগত ১৭ বছর আন্দোলন-সংগ্রামে থাকা ত্যাগী ও এলাকার জনপ্রিয় ব্যক্তিরাই পাচ্ছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)’র সমর্থন এমনটাই আভাস পাওয়া যায় দলটির বিশ্বস্ত সূত্রে।
সূত্রমতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে বিএনপি। দলটির হাইকমান্ড সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা এবং পৌরসভা নির্বাচনে কেবল দলীয় পদ-পদবি থাকলেই কেউ মনোনয়ন বা সমর্থন পাবেন না। বরং যারা গত দেড় দশকে রাজপথে সক্রিয় ছিলেন, জেল-জুলুম সহ্য করেছেন এবং সাধারণ মানুষের কাছে যাদের গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তা বেশি, তাদেরই অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
তৃণমূল থেকে আসবে নেতৃত্ব বিএনপির উচ্চপর্যায়ের সূত্রগুলো বলছে, বিগত আন্দোলনের সময় অনেক প্রভাবশালী নেতাকে মাঠে পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে, অনেক তরুণ এবং নিবেদিতপ্রাণ কর্মী মামলা-হামলা উপেক্ষা করে তৃণমূল পর্যায়ে দলকে টিকিয়ে রেখেছেন। এবার সেই ‘ত্যাগী’ নেতাদের মূল্যায়ন করতে চায় বিএনপি।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়ায় তৃণমূলের মতামতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার জন্য জেলা ও বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদকদের বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
জনপ্রিয়তা ও ত্যাগের মেলবন্ধন বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমরা দেখেছি বিগত দিনে অনেক জনপ্রিয় নেতা দলের পদ না পেয়েও সাধারণ মানুষের দুঃসময়ে পাশে দাঁড়িয়েছেন। আবার অনেক বড় পদে থেকেও কেউ কেউ সংকটের সময় আত্মগোপনে ছিলেন। এবার আমরা সেই ভুল সংশোধন করতে চাই। যারা জনগণের কাছে জনপ্রিয় এবং দলের জন্য ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তাদের সমন্বয় করেই প্রার্থী করা হবে।
বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করতে পারে এমন ক্লিন ইমেজের প্রার্থীদের দিকে বিশেষ নজর রয়েছে বিএনপির। দলের কৌশলগত পরিকল্পনা হলো, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ভালো ফল করার মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ে নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি পুনরায় প্রমাণ করা।
বিদ্রোহী প্রার্থী দমনে কঠোর অবস্থান মনোনয়ন বা সমর্থন দেওয়ার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিদ্রোহী প্রার্থীদের ব্যাপারেও কঠোর অবস্থান নেবে দলটি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিএনপির এই ‘নতুন ব্লু-প্রিন্ট’ সফল হলে স্থানীয় সরকার কাঠামোতে দলটির ভিত্তি আরও মজবুত হবে। বিগত বছরগুলোতে নির্বাচনে অংশ নেওয়া বা না নেওয়া নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে থাকা দলটি এবার তৃণমূলকে চাঙ্গা করতে জনপ্রিয়তাকেই মূল অস্ত্র হিসেবে বেছে নিয়েছে। এটি কেবল নির্বাচন নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে দলের নেতৃত্বের মান উন্নয়নেও বড় ভূমিকা রাখবে।
বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষা এবং জনগণের আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটানোই হবে আগামী স্থানীয় নির্বাচনের প্রধান লক্ষ্য। যারা দুঃসময়ে দলের পতাকা ধরে রেখেছিলেন এবং যাদের জন্য সাধারণ মানুষ ভোট দিতে আগ্রহী, তারাই হবেন বিএনপির আগামীর কাণ্ডারি।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির একাধিক সূত্র ইঙ্গিত দিয়েছে, বিশেষ করে সিটি কর্পোরেশন এবং পৌরসভার মেয়র নির্বাচনের ক্ষেত্রে এবার প্রার্থী মনোনয়নে বড় ধরনের চমক থাকতে পারে। এমন কিছু ক্লিন ইমেজের নতুন মুখকে সামনে আনা হতে পারে, যা সাধারণের চিন্তার বাইরে। আবার মাঠে গ্রহণযোগ্যতা না থাকলে অনেক সিনিয়র ও প্রভাবশালী নেতাও শেষ পর্যন্ত বঞ্চিত হতে পারেন।
স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষভাবে আয়োজনে নির্বাচন কমিশন ইতোমধ্যে প্রস্তুতি গ্রহণ শুরু করেছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি রয়েছে।
নির্বাচন কমিশন প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে প্রথমবারের মতো আইটি সাপোর্টেড পোস্টাল ব্যালট রেজিস্ট্রেশন পদ্ধতি চালু করে। আগামী জাতীয় নির্বাচনে এই উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে। সর্বোচ্চসংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশিকে এই পদ্ধতির আওতায় আনতে নির্বাচন কমিশন কাজ করে যাচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, স্থানীয় নির্বাচন মূলত জনসম্পৃক্ততার ওপর নির্ভর করে। যেহেতু এই নির্বাচন দলীয় প্রতীকে হচ্ছে না, সে ক্ষেত্রে এলাকায় যাদের সাংগঠনিক ভিত্তি শক্ত, পাশাপাশি দলের প্রতি অতীত ত্যাগ-তিতিক্ষা রয়েছে, তাদেরই মনোনয়ন বা সমর্থনে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
দলের স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, বড় দলে মনোনয়নপ্রত্যাশী বেশি থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। তবে জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা, দলের প্রতি ত্যাগ ও অবদানই হবে মূল বিচার্য। দলের সিদ্ধান্তের বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ কারও নেই।
এ প্রসঙ্গে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী বলেন, যারা দলের ত্যাগী ও বিশ্বস্ত এবং বিগত দিনের আন্দোলন-সংগ্রামে রাজপথে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন, তারাই অগ্রাধিকার পাবেন। তৃণমূল এবং স্থানীয় জনগণের সঙ্গে সম্পর্কের গভীরতা গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে।
এ প্রসঙ্গে বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা জয়নুল আবদিন ফারুক এমপি বলেন, প্রধানমন্ত্রী স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন। অতীতের মতো হানাহানির স্থানীয় নির্বাচন তিনি করতে চান না।
তিনি বলেন, জনপ্রিয় অথাৎ সমাজের যারা সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি, যারা কোনো অপকর্মে জড়িত নয়, অতীতে আন্দোলন সংগ্রামে যাদের ভূমিকা আছে তাদেরকেই বেছে নেওয়া উচিত বলে আমি মনে করি।
(মাজাহারুল ইসলাম)