বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক অনলাইন পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম পেপ্যাল চালুর আলোচনা যেন এক দীর্ঘ প্রতীক্ষার গল্প। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বারবার আশার সঞ্চার, উদ্যোগের ঘোষণা, উচ্চপর্যায়ের বৈঠক—কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বারবারই ব্যর্থতা।
তবে এবার প্রেক্ষাপট কিছুটা ভিন্ন। জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরাসরি ঘোষণা দিয়েছেন—বাংলাদেশে পেপ্যালের কার্যক্রম চালু করতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, এমনকি এ লক্ষ্যে একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে।
২০১৬ থেকে অপেক্ষা
বাংলাদেশে পেপ্যাল চালুর আলোচনা শুরু হয় মূলত ২০১০-এর দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে। ২০১৬ সালে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সঙ্গে চুক্তি হয়, এমনকি ২০১৭ সালে ব্যাপক প্রচার প্রচারণা চালিয়ে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়—সব মিলিয়ে তখন বড় ধরনের প্রত্যাশা তৈরি হয়।
কিন্তু সেই সময় বাস্তবে চালু হয় কেবল Xoom—যা পেপ্যালের একটি সহায়ক সেবা। ২০১৭ সালের ১৯ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে PayPal Xoom সেবা। ওই দিন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় রাজধানীর এক অনুষ্ঠানে এ সেবার উদ্বোধন ঘোষণা করেন। এটি দিয়ে প্রবাসীরা বাংলাদেশে অর্থ পাঠাতে পারলেও ফ্রিল্যান্সারদের আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গ্রহণ বা অনলাইন ব্যবসার পূর্ণাঙ্গ সুবিধা কখনোই চালু হয়নি।
পরবর্তী সময়ে ২০২১ সালেও পেপ্যাল চালুর ঘোষণা আসে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে সময়সীমাও নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে ফ্রিল্যান্সারদের কাছে “পেপ্যাল আসছে”—এটি এক ধরনের পুনরাবৃত্ত প্রতিশ্রুতিতে পরিণত হয়।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতির জন্য পেপ্যাল শুধু একটি পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম নয়—এটি বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত হওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন। তারা বলছেন এবারের উদ্যোগ সফল হলে বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সার, উদ্যোক্তা ও ডিজিটাল অর্থনীতির জন্য এটি হতে পারে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন।
কেন বারবার থেমে গেছে উদ্যোগ?
বাংলাদেশে বহুল আলোচিত আন্তর্জাতিক অনলাইন পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম PayPal দীর্ঘদিন ধরেই চালুর আলোচনা থাকলেও বাস্তবে তা কার্যকর হয়নি।
বাংলাদেশে পেপ্যাল চালু না হওয়ার কারণগুলো কেবল প্রযুক্তিগত নয়; বরং এটি একটি জটিল নীতিগত, আর্থিক ও আন্তর্জাতিক কাঠামোর সঙ্গে জড়িত। এ নিয়ে নীতিনির্ধারক, প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও আর্থিক খাত সংশ্লিষ্টদের মধ্যে নানা ব্যাখ্যা রয়েছে। বিশ্লেষণে দেখা যায়, একাধিক প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কারণের সমন্বয়েই পেপ্যালের কার্যক্রম দেশে চালু করা সম্ভব হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রধান বাধাগুলোর একটি হলো দেশের আর্থিক লেনদেন ব্যবস্থায় পূর্ণাঙ্গ ‘ফাইন্যান্সিয়াল সেটেলমেন্ট’ কাঠামোর অভাব। অনলাইনে প্রতারণা বা আর্থিক জালিয়াতির ঘটনা ঘটলে তাৎক্ষণিক প্রতিকার দেওয়ার মতো ২৪ ঘণ্টার কোনও কেন্দ্রীয় সাপোর্ট সিস্টেম এখনও গড়ে ওঠেনি। ফলে আন্তর্জাতিক মানের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা অনুপস্থিত রয়ে গেছে।
এছাড়া, ব্যবহারকারীদের নির্ভরযোগ্য পরিচয় ও ঠিকানা যাচাইকরণ (কেওয়াইসি ও অ্যাড্রেস ভেরিফিকেশন) ব্যবস্থার দুর্বলতাও বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। পেপ্যালের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো ব্যবহারকারীর তথ্য যাচাইয়ের ওপর অত্যন্ত নির্ভরশীল হওয়ায় এই সীমাবদ্ধতা তাদের কার্যক্রম পরিচালনায় জটিলতা তৈরি করে।
পেপ্যালের ব্যবসায়িক কাঠামোও এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এটি কেবল একটি পেমেন্ট গেটওয়ে নয়, বরং দ্বিমুখী লেনদেননির্ভর একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল মার্কেটপ্লেস। কিন্তু বাংলাদেশে বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন দীর্ঘদিন ধরে নিয়ন্ত্রিত ও অনেকাংশে একমুখী (ইনওয়ার্ড রেমিট্যান্সনির্ভর) থাকায় এই প্ল্যাটফর্মের পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম চালু করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
নিয়ন্ত্রক দিক থেকেও রয়েছে সীমাবদ্ধতা। বাংলাদেশ ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনে দীর্ঘদিন ধরে কঠোর নীতি অনুসরণ করে আসছে। পেপ্যাল চালুর জন্য প্রয়োজন অবাধ অর্থপ্রবাহ—অর্থাৎ টাকা আসা-যাওয়ার স্বাধীনতা (inflow ও outflow)—যা বর্তমান কাঠামোয় সীমিত।
পরোক্ষ কারণগুলোর মধ্যে আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের ঘাটতিও উল্লেখযোগ্য। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বাংলাদেশ থেকে পেপ্যাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের অনেক উদ্যোগ ভারতের আঞ্চলিক কার্যালয়ের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। এতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া ধীরগতির হয়ে পড়ে এবং প্রত্যাশিত অগ্রগতি ব্যাহত হয়।
সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, পেপ্যাল চালুর ক্ষেত্রে শুধু প্রযুক্তিগত প্রস্তুতিই নয়, বরং নীতিগত সংস্কার, আর্থিক নিরাপত্তা অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক সমন্বয় জোরদার করা জরুরি। যদিও সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচ্চপর্যায়ে একাধিকবার আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছে, তবু এসব মৌলিক সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে না পারায় কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি এখনও অধরাই রয়ে গেছে।
নতুন করে আশার আলো যেখান থেকে
২০২৫ সালের শেষভাগ থেকে পরিস্থিতিতে কিছু পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। সাবেক গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর ঘোষণা দেন—পেপ্যাল বাংলাদেশে কার্যক্রম শুরু করতে আগ্রহী। পরবর্তীতে উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল ঢাকায় এসে সরকার, ব্যাংকার এবং আইসিটি খাতের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করে।
২০২৬ সালের শুরুতে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী জানান, পেপ্যাল “নীতিগতভাবে আগ্রহী”, তবে এটি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। অর্থাৎ তাৎক্ষণিক চালুর সম্ভাবনা না থাকলেও আলোচনার গতি আগের যেকোনও সময়ের তুলনায় বেশি। এবার সেই ধারাবাহিকতায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সংসদীয় ঘোষণা বিষয়টিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।
নতুন বাস্তবতা: কেন এবার ভিন্ন?
অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে ২০২৫ সালের পর থেকে পরিস্থিতিতে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। প্রথমত, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে সাবেক গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর ঘোষণা দেন যে পেপ্যাল বাংলাদেশে ব্যবসা করতে আগ্রহী। তিনি বলেছিলেন, মূলত ফ্রিল্যান্সার, ই-কমার্স উদ্যোক্তা ও আইটি খাতে সহজ লেনদেন নিশ্চিত করতেই পেপ্যাল চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ওই সময় পেপ্যালের দক্ষিণ এশিয়া (সিঙ্গাপুরভিত্তিক) টিম বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সার ও আইসিটি বিভাগের সঙ্গে বৈঠকও করেছিল।
দ্বিতীয়ত, পেপ্যালের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল ঢাকায় এসে সরকার, ব্যাংকার এবং আইসিটি খাতের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করে—যা অতীতে খুব কমই ঘটেছে।
তৃতীয়ত, চলতি বছরের শুরুতে তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা ড মুহাম্মদ ইউনূসের বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী স্পষ্টভাবে বলেন—পেপ্যাল “নীতিগতভাবে আগ্রহী”, যদিও এটি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া।
চতুর্থত, ডিজিটাল অর্থনীতির বিস্তার এবং ফ্রিল্যান্সিং খাতের দ্রুত বৃদ্ধি—এই দুটি বিষয় পেপ্যালের মতো প্ল্যাটফর্মের প্রয়োজনীয়তা আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
বাস্তবায়নের ঘোষণা ইশতেহারে
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক ঘোষণার মাধ্যমে বিষয়টি আবারও রাজনৈতিক অগ্রাধিকার পেয়েছে। এর আগে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট সিস্টেম, যেমন- পেপ্যাল—চালুর উদ্যোগ নেওয়ার ঘোষণা দেয়।
বুধবার (১৫ এপ্রিল) জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ে পেপ্যালের কার্যক্রম শুরু করতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, হাইটেক পার্ক ও আইসিটি সেন্টারগুলোর কার্যকর পরিচালনা এবং দেশে পেপ্যালের কার্যক্রম চালু করতে ইতোমধ্যে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
অর্থাৎ সরকার জানিয়েছে—পেপ্যাল চালুর জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে, হাইটেক পার্ক ও আইসিটি অবকাঠামোর সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে, আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ে চালুর পরিবেশ তৈরির কাজ চলছে। এটি ইঙ্গিত দেয় যে বিষয়টি এখন আর কেবল আলোচনার পর্যায়ে নেই; বরং বাস্তবায়নের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি শুরু হয়েছে।
তাহলে কি এবার সত্যিই আসছে?
সব কিছু বিবেচনায় নিয়ে বলা যায়—বাংলাদেশে পেপ্যাল চালুর সম্ভাবনা এখন আগের যেকোনও সময়ের তুলনায় বেশি বাস্তবসম্মত। কারণ সরকার সরাসরি উদ্যোগ নিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অবস্থান তুলনামূলক ইতিবাচক। পেপ্যালের উচ্চপর্যায়ের আগ্রহ রয়েছে। ডিজিটাল অর্থনীতির প্রয়োজনীয়তা বেড়েছে।
কারা সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবে?
পেপ্যাল চালু হলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বহুমাত্রিক প্রভাব পড়তে পারে। পেপ্যাল চালু হলে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসবে তিনটি খাতে:
ফ্রিল্যান্সার ও আউটসোর্সিং খাত
বর্তমানে অনেক ফ্রিল্যান্সার পেমেন্ট পেতে বিকল্প ও ব্যয়বহুল পদ্ধতির ওপর নির্ভর করেন। পেপ্যাল চালু হলে দ্রুত, নিরাপদ ও সরাসরি পেমেন্ট গ্রহণ সম্ভব হবে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বড় ফ্রিল্যান্সিং বাজার। কিন্তু পেমেন্ট জটিলতার কারণে অনেকেই আয়ের পূর্ণ সুবিধা পান না। পেপ্যাল চালু হলে এই বাধা দূর হবে।
ই-কমার্স ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা
ছোট উদ্যোক্তারা সহজেই আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য বিক্রি করে অর্থ দেশে আনতে পারবেন।
রেমিট্যান্স প্রবাহ
প্রবাসীরা সহজে অর্থ পাঠাতে পারলে আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে রেমিট্যান্স বাড়তে পারে।
ডিজিটাল অর্থনীতির গতি বৃদ্ধি
ক্যাশলেস ট্রানজেকশন, অনলাইন ব্যবসা ও স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম আরও শক্তিশালী হবে।
বাস্তবতা বনাম প্রত্যাশা
তবে বাস্তবতা হচ্ছে—পেপ্যাল চালু করা শুধু রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং একটি জটিল আর্থিক ও প্রযুক্তিগত প্রক্রিয়া। পেপ্যাল নিজস্ব ঝুঁকি মূল্যায়ন, নিয়ন্ত্রক পরিবেশ, বাজার সম্ভাবনা এবং নিরাপত্তা অবকাঠামো যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে একটি কমিটি গঠন বা আগ্রহ প্রকাশ—এই দুটি ধাপের পরও বাস্তবায়নে সময় লাগবে।