লেবাননে ইসরায়েলি হামলা বন্ধ ও যুদ্ধবিরতি কার্যকর করতে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করেছে সৌদি আরব। ইরানের সঙ্গে চলমান আলোচনা টিকিয়ে রাখা এবং পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি পুনরায় সচল করার লক্ষ্যেই রিয়াদ এই মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই এ খবর জানিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র, পশ্চিমা ও আরব বিশ্বের একাধিক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বুধবার এক ব্যক্তিগত ফোনালাপে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে লেবাননে যুদ্ধবিরতির গুরুত্ব বোঝাতে সচেষ্ট হন। যুবরাজের এই লবিংয়ের পরই বৃহস্পতিবার বিকালে ট্রাম্প ১০ দিনের একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেন।
পশ্চিমা এক কর্মকর্তা বলেন, মোহাম্মদ বিন সালমান চান হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়া হোক। তিনি ট্রাম্পকে সরাসরি বলেছেন, এই লক্ষ্য অর্জন এবং সামগ্রিক যুদ্ধ বন্ধের জন্য লেবাননে যুদ্ধবিরতি এখন অত্যন্ত জরুরি।
এদিকে আগামী সপ্তাহে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে বৈঠক করতে পারেন। বৈঠকে যুবরাজের ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী খালিদ বিন সালমানও যোগ দিতে পারেন বলে জানা গেছে। সৌদি কর্মকর্তারা ইতোমধ্যে একটি খসড়া আলোচনার নথিও বিভিন্ন মহলে প্রচার করছেন।
ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এবং তেহরানের শীর্ষ এক আলোচক জোর দিয়ে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অর্থবহ আলোচনার জন্য লেবাননে যুদ্ধবিরতি হওয়া বাধ্যতামূলক। যদিও এর আগে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দুই সপ্তাহের একটি যুদ্ধবিরতি ঘোষিত হয়েছিল এবং তাতে লেবানন অন্তর্ভুক্ত ছিল বলে ইসলামাবাদ ও ইরান দাবি করলেও ইসরায়েল লেবাননে হামলা চালিয়ে যাচ্ছিল।
হিজবুল্লাহ অবশ্য বিরল এই প্রত্যক্ষ আলোচনার জন্য লেবানন সরকারের কড়া সমালোচনা করেছে। অন্যদিকে ট্রাম্প গত সপ্তাহে দাবি করেছিলেন যে নেতানিয়াহু লড়াই কিছুটা ‘কমাতে’ রাজি হয়েছেন, তবে ইরান চায় পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি। যদি এই লেবানন চুক্তি স্থায়ী হয়, তবে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার যুদ্ধবিরতির মেয়াদ ২১ এপ্রিলের পর বাড়ানোর পথ প্রশস্ত হবে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তান সামনে থাকলেও নেপথ্যে সৌদি আরবের বড় ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। রিয়াদ ও ইসলামাবাদের মধ্যে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি রয়েছে এবং সৌদি আরব নিয়মিত পাকিস্তানকে অর্থনৈতিক সহায়তা দিয়ে আসছে। চলতি সপ্তাহেও ঋণে জর্জরিত পাকিস্তানকে ৩ বিলিয়ন ডলার ঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সৌদি আরব।
পশ্চিমা এক কর্মকর্তা রিয়াদের এই দ্বিমুখী অবস্থানকে ‘এক ধরনের নৃত্য’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, সৌদি আরব শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের ডাকে সাড়া দিয়ে ট্রাম্পকে খুশি করার জন্য যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু সমর্থন দিয়েছিল। এমনকি ইরানে হামলার সময় তায়েফের কিং ফাহাদ বিমান ঘাঁটিও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য খুলে দিয়েছিল। কিন্তু এখন তারা উত্তেজনা কমাতে চায় এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার দিকেই তাদের মূল মনোযোগ।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এর আগে জানিয়েছিল, সৌদি আরব হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন অবরোধ না দেওয়ার জন্য ট্রাম্পকে অনুরোধ করেছে। সৌদি আরব তাদের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের মাধ্যমে লোহিত সাগর দিয়ে দিনে প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল তেল রফতানি করতে পারলেও তারা এখন শঙ্কিত ইয়েমেনের হুথিদের নিয়ে। রিয়াদ এখন আপ্রাণ চেষ্টা করছে যাতে হুথিরা বাব আল-মানদেব প্রণালি বন্ধ করে না দেয়।
ইসলামাবাদে আগামী দুই দিনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আলোচনা পুনরায় শুরু হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন ট্রাম্প। তবে ইসরায়েল শেষ পর্যন্ত এই যুদ্ধবিরতি পুরোপুরি মেনে চলবে কিনা এবং নেতানিয়াহুর ওপর ট্রাম্প কতটা চাপ প্রয়োগ করবেন, তা নিয়ে এখনও ধোঁয়াশা কাটেনি।