রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অপরাধের এক নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে ‘পেন গান’ নামে পরিচিত একটি ছদ্মবেশী আগ্নেয়াস্ত্র। দেখতে সাধারণ ধাতব কলমের মতো হলেও এর ভেতরে লুকিয়ে থাকে প্রাণঘাতী শক্তি। ক্ষুদ্র আকার, সহজে বহনযোগ্যতা এবং শনাক্ত করা কঠিন হওয়ায় এটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য এক নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় এই অস্ত্র ব্যবহারের প্রমাণ মেলায় বিষয়টি নিয়ে জনমনে আতঙ্কও বাড়ছে।
কী এই পেন গান?
‘পেন গান’ মূলত একটি ছোট আকারের আগ্নেয়াস্ত্র, যা দেখতে হুবহু একটি ধাতব কলমের মতো। এর ভেতরে কালি নয়, বরং লুকিয়ে থাকে বুলেট। সাধারণত .২২ বা .২৫ ক্যালিবারের গুলি এতে ব্যবহার করা হয়। এটি সিঙ্গেল-শট অস্ত্র—অর্থাৎ একবারে একটি গুলি ছোড়া যায়। তবে এর ক্ষুদ্রতা এবং ব্যবহারের সহজতার কারণে এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক।
এই অস্ত্রের কাঠামো সাধারণত একটি ব্যারেল, ফায়ারিং পিন এবং স্প্রিং-ভিত্তিক মেকানিজম দিয়ে তৈরি। ব্যবহারকারী কলমটির মাঝখান খুলে বুলেট লোড করেন এবং স্প্রিংচালিত লিভার বা পিন চাপলেই গুলি ছুটে যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক ক্ষেত্রে এটি তুলনামূলকভাবে কম শব্দ করে, যা এটিকে আরও ভয়ংকর করে তোলে।
সাম্প্রতিক ঘটনার প্রেক্ষাপট
সম্প্রতি পুরান ঢাকার নয়াবাজার এলাকায় এক রাজনৈতিক কর্মীকে লক্ষ্য করে হামলার ঘটনায় পেন গান ব্যবহারের বিষয়টি সামনে আসে। ওই ঘটনায় একজন যুবদল নেতা গুলিবিদ্ধ হন। পরে অভিযান চালিয়ে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) দুজনকে গ্রেপ্তার করে এবং তাদের কাছ থেকে একটি পেন গান উদ্ধার করে।
তদন্তে জানা যায়, অস্ত্রটি একটি সিগারেটের প্যাকেটের ভেতরে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। এ তথ্য থেকেই স্পষ্ট হয়, এই ধরনের অস্ত্র কতটা সহজে আড়ালে রাখা সম্ভব এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দেওয়ার জন্য কতটা কার্যকর হতে পারে।
কেন বাড়ছে উদ্বেগ?
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, পেন গান কয়েকটি বিশেষ কারণে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ:
প্রথমত, এটি সহজে শনাক্ত করা যায় না। সাধারণ তল্লাশিতে এটি একটি সাধারণ কলম হিসেবেই ধরা পড়ে।
দ্বিতীয়ত, এর আকার ছোট হওয়ায় এটি বহন করা খুব সহজ। শার্টের পকেট, ব্যাগ, এমনকি ডায়েরির ভাঁজেও রাখা যায়।
তৃতীয়ত, একবার গুলি ছুড়লেও তা প্রাণঘাতী হতে পারে। কাছ থেকে ব্যবহার করলে এর ক্ষতি মারাত্মক।
চতুর্থত, অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব অস্ত্রে কোনো সিরিয়াল নম্বর বা উৎপাদন সংক্রান্ত তথ্য থাকে না। ফলে এর উৎস বা সরবরাহ চক্র শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, “এটি প্রচলিত অস্ত্রের মতো নয়। এটি একটি ছদ্মবেশী হুমকি, যা নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।”
কীভাবে দেশে আসছে?
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন, পেন গান চোরাচালানের মাধ্যমে দেশে প্রবেশ করছে। সীমান্ত দিয়ে ছোট আকারে পাচার করা সহজ হওয়ায় এটি অপরাধীদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।
এছাড়া কিছু ক্ষেত্রে অস্ত্রের অংশ আলাদাভাবে এনে দেশে জোড়া লাগানোর সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। এতে করে পুরো অস্ত্র শনাক্ত করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক অপরাধচক্রের সঙ্গে স্থানীয় চক্রের যোগাযোগ থাকলে এ ধরনের অস্ত্রের বিস্তার আরও বাড়তে পারে।
সম্ভাব্য ব্যবহার ও ঝুঁকি
পেন গান মূলত টার্গেট কিলিং বা পরিকল্পিত হামলার জন্য ব্যবহারযোগ্য বলে মনে করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। কারণ এটি সহজে বহনযোগ্য এবং দ্রুত ব্যবহার করা যায়। জনাকীর্ণ এলাকায় বা রাজনৈতিক সমাবেশে এটি ব্যবহার করা হলে তাৎক্ষণিকভাবে হামলাকারীকে শনাক্ত করা কঠিন হতে পারে।
ব্যক্তিগত শত্রুতা, চাঁদাবাজি কিংবা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডেও এর ব্যবহার বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলেও এই অস্ত্র ব্যবহারের তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানা গেছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পদক্ষেপ
পুলিশ জানিয়েছে, পেন গানসহ ছদ্মবেশী অস্ত্রের উৎস ও সরবরাহ চক্র শনাক্ত করতে একাধিক গোয়েন্দা টিম কাজ করছে। সীমান্ত নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি নগর এলাকায় বিশেষ অভিযানও চালানো হচ্ছে।
এছাড়া বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার বৈঠকেও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা হচ্ছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষণ প্রতিবেদনে এই অস্ত্রকে সম্ভাব্য বড় হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
পুলিশ সপ্তাহে বিশেষ নিষেধাজ্ঞা
আগামী ১০ মে থেকে শুরু হতে যাওয়া পুলিশের বার্ষিক আয়োজন ‘পুলিশ সপ্তাহ’-কে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়েছে। এবারের আয়োজনে ছুরি, চাকু, আগ্নেয়াস্ত্রের পাশাপাশি মেটাল পেন বহনও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের একটি সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনার সময় পেন গানের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়। এরপরই দাওয়াত কার্ডে নিষিদ্ধ সামগ্রীর তালিকায় মেটাল পেন যুক্ত করা হয়।
কারণ, মেটাল পেন দেখতে অনেক সময় পেন গানের মতো হওয়ায় নিরাপত্তা তল্লাশিতে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতামত
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পেন গান শুধু একটি অস্ত্র নয়, এটি অপরাধ কৌশলের একটি নতুন ধারা। প্রযুক্তিগত সরলতা এবং ছদ্মবেশী বৈশিষ্ট্যের কারণে এটি ভবিষ্যতে আরও বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
তাদের মতে, এ ধরনের অস্ত্র মোকাবিলায় শুধু আইন প্রয়োগই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন প্রযুক্তিনির্ভর তল্লাশি ব্যবস্থা, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা।
জনসচেতনতার গুরুত্ব
সাধারণ মানুষের মধ্যেও সচেতনতা বাড়ানো জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সন্দেহজনক আচরণ, অস্বাভাবিক বস্তু বা সন্দেহজনক ব্যক্তির বিষয়ে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানানো প্রয়োজন।
বিশেষ করে জনসমাগমপূর্ণ স্থান, রাজনৈতিক কর্মসূচি কিংবা রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে নিরাপত্তা সতর্কতা আরও বাড়াতে হবে।
‘পেন গান’ একটি ছোট অস্ত্র হলেও এর প্রভাব বড়। এটি শুধু অপরাধের নতুন একটি উপকরণ নয়, বরং নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য এক নতুন চ্যালেঞ্জ। এর ছদ্মবেশী বৈশিষ্ট্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে যেমন ভাবিয়ে তুলেছে, তেমনি সাধারণ মানুষের মাঝেও উদ্বেগ তৈরি করেছে।
এই পরিস্থিতিতে কঠোর নজরদারি, কার্যকর গোয়েন্দা তৎপরতা এবং জনসচেতনতা—এই তিনটির সমন্বয়ই হতে পারে এই নতুন আতঙ্ক মোকাবিলার প্রধান উপায়। সময়োপযোগী পদক্ষেপ না নিলে ‘পেন গান’ ভবিষ্যতে আরও বড় নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে—এমন আশঙ্কা এখনই উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
ভোরের আকাশ/এনএস