জাতীয় সংসদের প্রাণ হচ্ছে কার্যপ্রণালি বিধি। কিন্তু ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অধিকাংশ এমপি এই বিধিমালা সম্পর্কে সম্যক ধারণা না রেখেই সংসদ অধিবেশনে যোগ দিয়েছেন। এর ফলে গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় বিতর্কে অংশগ্রহণ, নোটিশ প্রদান এবং পয়েন্ট অব অর্ডারে কথা বলার ক্ষেত্রে তারা প্রায়ই খেই হারিয়ে ফেলছেন। সংসদে সদস্যদের অনভিজ্ঞতা ও নিয়মভঙ্গের কারণে সংসদীয় কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বলে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
বারবার প্রক্রিয়াগত ভুল, সময় না মেনে কথা বলা এবং নিয়ম না জানার কারণে স্পিকারকে হস্তক্ষেপ করতে হচ্ছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের ৩০০ সদস্যের মধ্যে ২১৯ জনই প্রথমবারের মতো নির্বাচিত হয়েছেন। যদিও শুরুতে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল, তবুও সংসদীয় নিয়ম-কানুন বোঝা ও অনুসরণে অনেক সদস্য এখনও সমস্যায় রয়েছেনÑ ধারণা বিশ্লেষকদের।
সংসদীয় রেওয়াজ অনুযায়ী, অধিবেশন কক্ষের ভেতরে চা-পান, ধূমপান কিংবা কোনো ধরনের খাবার খাওয়ার অনুমতি নেই। সংসদ সদস্যদের শৃঙ্খলা ও মর্যাদা রক্ষায় বিষয়টি সবসময় কঠোরভাবে পালন করা হয়। সংসদের কার্যপ্রণালি বিধির ৩১১ নম্বর বিধি অনুযায়ী, সংসদ কক্ষটি সংসদের আনুষ্ঠানিক বৈঠক ছাড়া অন্য কোনো কাজে ব্যবহার করার সুযোগ নেই। খাওয়া-দাওয়া বা পানীয় গ্রহণ যেহেতু আনুষ্ঠানিক বৈঠকের অংশ নয়, তাই এ ধরনের কাজ বিধির পরিপন্থি বলে গণ্য হয়।
গত কয়েক সপ্তাহের সংসদ অধিবেশন পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, অনেক নতুন সদস্য জানেন না কখন এবং কীভাবে পয়েন্ট অব অর্ডার উত্থাপন করতে হয়। প্রায়ই দেখা যায়, স্পিকারের অনুমতি ছাড়াই কথা বলা শুরু করেন কিংবা এমন সব বিষয়ে পয়েন্ট অব অর্ডার দাবি করেন যা কার্যপ্রণালি বিধির আওতায় পড়ে না। ফলে স্পিকারকে বারবার বিধিমালা মনে করিয়ে দিতে হচ্ছে।
সংসদ সচিবালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, একজন সংসদ সদস্যকে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হলে প্রথমেই তাকে ‘রুলস অব প্রসিডিউর’ বা কার্যপ্রণালি বিধি আয়ত্ত করতে হয়। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, অধিকাংশ নবীন সদস্য এই বিশাল গ্রন্থটি পড়ার চেয়ে অন্যের দেখাদেখি কথা বলা পছন্দ করেন।
নোটিশ প্রদানে অদক্ষতা সংসদীয় কার্যক্রমে প্রশ্নোত্তরের পাশাপাশি ৭১ বিধিতে জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নোটিশ দেওয়া একটি অত্যন্ত শক্তিশালী মাধ্যম। কিন্তু তথ্য বলছে, অনেক এমপি সঠিকভাবে নোটিশের বয়ান লিখতে পারছেন না। অনেক ক্ষেত্রে তাদের দেওয়া নোটিশগুলো বিধিসম্মত না হওয়ায় তা বাতিল হয়ে যাচ্ছে। কমিটির বৈঠক ও বিধিবিধান সংসদের স্থায়ী কমিটিগুলোতেও নবীন সদস্যদের সক্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কমিটির বৈঠকগুলোতে মন্ত্রণালয়ের ভুলত্রুটি ধরার জন্য যে ধরনের কারিগরি জ্ঞান ও বিধির দখল প্রয়োজন, তা অনেক নতুনের মধ্যেই অনুপস্থিত।
প্রশিক্ষণ ও করণীয়: সংসদ সচিবালয়ের পক্ষ থেকে নবীন এমপিদের জন্য ওরিয়েন্টেশন কোর্সের আয়োজন করা হলেও তা পর্যাপ্ত নয় বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, সংসদীয় গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে হলে এমপিদের ব্যক্তিগতভাবে পড়াশোনার বিকল্প নেই। বিশ্বের অন্যান্য সংসদে নতুন সদস্যদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি মেন্টরশিপ প্রোগ্রামের ব্যবস্থা থাকে, যা বাংলাদেশেও চালু করা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞ মতামত: সংসদীয় বিশ্লেষকদের মতে, একজন এমপির জন্য প্রথম এক-দুই বছর মূলত শেখার সময়। তবে কার্যপ্রণালি বিধি না জানলে তারা জনগণের সমস্যাগুলো আইনসভায় সঠিকভাবে তুলে ধরতে ব্যর্থ হন। এতে কেবল সংসদের সময় নষ্ট হয় না, বরং একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে তাদের কার্যকারিতাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
এমপিদের এই সংসদীয় ‘লার্নিং কার্ভ’ দ্রুত উত্তরণের জন্য দলীয়ভাবে এবং সংসদীয় ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে আরও নিবিড় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা আশা করছেন, সময়ের সাথে সাথে নবীন সদস্যরা নিজেদের দক্ষ করে গড়ে তুলবেন এবং সংসদীয় বিতর্কে গঠনমূলক অবদান রাখবেন।
এদিকে, গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় সংসদের মূল অধিবেশন কক্ষে বসে এক সংসদ সদস্যের খাওয়া-দাওয়ার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম। অধিবেশনে শৃঙ্খলা ও মর্যাদা বজায় রাখার স্বার্থে এমন আচরণের সমালোচনা করে স্পিকার বলেন, ‘পরে আরও কী খাবেন, গড নোজ (আল্লাহই জানেন)’।
প্রত্যক্ষদর্শী ও সংসদ সূত্রে জানা যায়, বিকেলে অধিবেশন চলাকালে স্পিকার তার চেয়ারে বসে হঠাৎ লক্ষ্য করেন এক সংসদ সদস্য কিছু একটা খাচ্ছেন। অধিবেশন কক্ষে খাওয়ার কোনো নিয়ম না থাকায় স্পিকার তৎক্ষণাৎ মাইকে তাকে প্রশ্ন করেন তিনি কী খাচ্ছেন।
স্পিকার জানতে চান- তিনি চা পান করছেন কি না। জবাবে ওই সংসদ সদস্য জানান, তিনি চা নয় বরং ‘গরম পানি’ পান করছেন।
সংসদ সদস্যের এমন উত্তরে স্পিকার কিছুটা ক্ষুব্ধ হয়ে বলেন, ‘পরে আরও কী খাবেন, গড নোজ’। এর আগে অতীতেও বিভিন্ন সময় অধিবেশন কক্ষে মোবাইল ফোন ব্যবহার বা খোশগল্প করার কারণে স্পিকারদের পক্ষ থেকে কড়া নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। তবে এবার সরাসরি খাবার গ্রহণের ঘটনায় সংসদে হাসাহাসি ও বিস্ময়ের সৃষ্টি হয়।
(মাজাহারুল ইসলাম)