দেশে বর্তমানে এইডসের চিকিৎসা নিচ্ছেন আট হাজার ৫০০ জন। তাদের প্রায় অর্ধেকই সমকামী। আর সমকামী আক্রান্তদের ৮০ ভাগই শিক্ষার্থী। স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মেডিকেল সব পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা রয়েছেন এই তালিকায়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এইডস নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির (এসটিডি) তথ্য ও মাঠ পর্যায়ের চিত্র বলছে, পরিস্থিতি ক্রমশ উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী তপন শিকদার (ছদ্মনাম)। বছর দুয়েক আগে ফেসবুকে স্ক্রল করতে গিয়ে সমকামীদের একটি গ্রুপ দেখতে পান। কৌতূহলবশত নিজেও যুক্ত হন। এক পর্যায়ে নিয়মিত হন সেই গ্রুপে। মাসখানেক যেতেই জড়িয়ে পড়েন সমকামিতায়। গত ২০ এপ্রিল তার এইচআইভি শনাক্ত হয়।
তপন বলেন, ‘সমকামিতায় কীভাবে জড়িয়ে গেছি, বলা মুশকিল। আমি যে আক্রান্ত, সেটি পরিবার ও অনেক কাছের বন্ধুরাও জানে না। অবস্থা এমন পর্যায়ে গেছে যেখান থেকে ফিরে আসা কঠিন। আক্রান্ত হওয়ার খবরে ভয় পাই। ওষুধ খাওয়া শুরু করেছি। কিন্তু রোগটা এমন যে, সামাজিকভাবে বলতেও পারছি না।’
তপন একা নন। ১১ মাস আগে এইচআইভি শনাক্ত হয় চাঁপাইনবাবগঞ্জের পলিটেকনিক শিক্ষার্থী সাদাতের (ছদ্মনাম)। ২২ বছরের এই তরুণও সমকামী। সম্প্রতি পেটে ব্যথা ও ওজন কমে যাওয়াসহ নানা জটিলতায় একাধিকবার হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে তাকে। সর্বশেষ গত ১৯ এপ্রিল ভর্তি হন ঢাকার একটি হাসপাতালে। নিজের আক্রান্ত হওয়া নিয়ে কিছু বলতে রাজি হননি তিনি।
এসটিডির তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৯ সাল থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত দেশে এইডসে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ১৪ হাজার ৩১৩। এর মধ্যে মারা গেছেন দুই হাজার ৬৬৬ জন। চিকিৎসাধীন আট হাজার ৫০০ জন ভর্তি রয়েছেন ১৬টি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও জেলা সদর হাসপাতালে।
অধিকাংশের বয়স ১০-২৪ বছর
এইডস নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির কেন্দ্রগুলো ঘুরে জানা গেছে, সমকামী আক্রান্তদের ২১ শতাংশের বয়স ১০ থেকে ১৯ বছরের মধ্যে। ৩১ শতাংশের বয়স ২০ থেকে ২৪ বছর। বাকি ৪৮ শতাংশের বয়স ২৫ বছরের বেশি। সমকামীদের বাইরে আক্রান্তদের মধ্যে সামরিক বাহিনীর সদস্যসহ নানা শ্রেণি ও পেশার মানুষ আছেন, যাদের একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন দেশের বাইরে ছিলেন।
দেশে সর্বোচ্চ এইচআইভি শনাক্ত হয় রাজধানীর বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএমইউ)। গত বছর এই কেন্দ্রে ২৯৩ জনের এইডস শনাক্ত হয়েছিল। চলতি বছর প্রতি মাসে ২০০ থেকে ২৫০টি পরীক্ষা হচ্ছে, যার মধ্যে ২৮ থেকে ৩০ জনের সংক্রমণ পাওয়া যাচ্ছে। তাদের ৭০ শতাংশই সমকামী।
দ্বিতীয় সর্বোচ্চ শনাক্তকরণ কেন্দ্র মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল। রোগ নির্ণয়ের পাশাপাশি আক্রান্তদের চিকিৎসায় এখানে ২৫ শয্যার আলাদা ইউনিট রয়েছে। বর্তমানে ২২ জন চিকিৎসাধীন। প্রতিদিন ছয় থেকে ১০ জন এইডসের ক্ষত নিয়ে আসছেন। ২০২৫ সালে এই কেন্দ্রে দুই হাজার ৯২টি পরীক্ষায় এইচআইভি শনাক্ত হয়েছে ২৭২ জনের। এর মধ্যে পুরুষ সমকামী ১১৭ জন, যাদের হাতেগোনা কয়েকজন ছাড়া অধিকাংশই শিক্ষার্থী।
হাসপাতালের পরামর্শক ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. লিটন খান বলেন, ‘একসময় যৌনকর্মী ও মাদকসেবীদের মাঝে আক্রান্তের হার বেশি থাকলেও বর্তমানে সবচেয়ে বেশি পাওয়া যাচ্ছে সমকামীদের মাঝে। তাদের বড় অংশই শিক্ষার্থী, এটি উদ্বেগজনক। অনেকে হয়তো এখনও লক্ষণ নিয়ে গোপনে রয়েছেন। পরিবেশ না পাওয়ায় অনেকে বলার সাহস পান না। এমনকি কাছের মানুষদের সঙ্গেও আলোচনা করতে ভয় পান কেউ কেউ। কারণ, এইডসে আক্রান্ত জানলেই সামাজিকভাবে এক ধরনের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়।’
এই হাসপাতালেই গ্লোবাল ফান্ডের অর্থায়নে আক্রান্তদের পরামর্শ দেন হরিপদ দাস। তিনি নিজেও এইচআইভিতে আক্রান্ত। হরিপদ দাস বলেন, ‘এইচআইভিতে আক্রান্ত হলে অনেকে ভেঙে পড়ে, কেউ মনে করে আর বাঁচবে না। তখন মানসিকভাবে সাপোর্ট দেওয়াটাই আমার কাজ। অনেক সময় তারা কথা বলতে চায় না। আমি নিজেই আক্রান্ত বলে জানালে, তখন তারা নির্ভয়ে কথা বলে, বেঁচে থাকার সাহস পায়।’
ঢাকার বাইরেও একই চিত্র। যশোর ২৫০ শয্যা হাসপাতাল কেন্দ্রে সাড়ে তিন শতাধিক এইচআইভি রোগী নিয়মিত চিকিৎসা নিচ্ছেন। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত তিন মাসে এক হাজার ২৪১ জনের নমুনা পরীক্ষায় শনাক্ত হয়েছেন ১৮ জন। এর মধ্যে ১২ জনই সমকামী এবং তাদের মধ্যে আটজন শিক্ষার্থী। কেন্দ্রটির পরামর্শক ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা সুদেব কুমার বিশ্বাস বলেন, ‘সমকামী মানেই যেন শিক্ষার্থী, পরিস্থিতি এমন অবস্থায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে। যারা আসছেন, কীভাবে কি হলো সব শুনে যতটা পারি প্রতিরোধের উপায়গুলো বলে দিই।’ চট্টগ্রাম, খুলনা, ঢাকা ও রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও শিক্ষার্থীদের আক্রান্তের হার প্রায় একই রকম।
সংক্রমণের ধরন বদলেছে
জাতীয় এইডস নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির সিনিয়র ম্যানেজার মো. আখতারুজ্জামান বলেন, ‘সাধারণ যে কোনো ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর চেয়ে সমকামীদের মাঝে এইচআইভি সংক্রমণের হার অনেক বেশি। কারণ, এক্ষেত্রে কোনো সুরক্ষা সামগ্রী ব্যবহার করা হয় না। একসময় এইচআইভি ছড়ানোর শীর্ষে ছিল নারী যৌনকর্মীরা। তবে এ নিয়ে পর্যাপ্ত কাজ হওয়ায় সেটি এখন নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। বিগত দশকে ছিল মাদকসেবীদের মাঝে, এটির বিস্তারও নিয়ন্ত্রণে। এখন সমকামীদের মাঝে বেশি ছড়াচ্ছে। শুধু বাংলাদেশ নয়, মিয়ানমার, থাইল্যান্ডসহ বিশ্বের যেসব দেশে এইচআইভির প্রকোপ রয়েছে, সব জায়গায় একই পরিস্থিতি।’
ইউএনএইডসের ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে এইডস আক্রান্তের সংখ্যা চার কোটি আট লাখ। এর একটি বড় অংশ সমকামী। তবে বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় সেবা দেওয়ার পথটি মসৃণ নয় বলে মনে করেন মো. আখতারুজ্জামান।
তিনি বলেন, ‘কোনো অবৈধ যৌনাচারই গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু যেহেতু এটি হচ্ছে, সেক্ষেত্রে জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষিত রাখা সরকারের দায়িত্ব। এ কারণে সমকামীদের নিয়েও কর্মসূচি রয়েছে। তবে যেহেতু সামাজিক ও ধর্মীয় কারণে এটির অস্তিত্বই অস্বীকার করা হয়, ফলে সেবা কার্যক্রমে অনেকটা চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। একজন মাদক ও যৌনকর্মীকে যত সহজে শনাক্ত, কাউন্সেলিং ও চিকিৎসার আওতায় আনা যায়, সমকামীদের ক্ষেত্রে চিত্রটি তার সম্পূর্ণ বিপরীত। কারণ, সমকামিতা মানুষের একটা অভ্যাসগত সমস্যা। এখানে জড়িতরা প্রায় সবাই শিক্ষিত। অনেকের সমাজে একটা অবস্থান রয়েছে। ফলে তারা গোপন রাখে।’
আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছেই
২০২১ সালে দেশে এইচআইভি আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৭২৯। গত বছর সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৮৯১-তে। এর আগের বছর, অর্থাৎ ২০২৪ সালে শনাক্ত হয়েছিল এক হাজার ৪৩৮ জন। আক্রান্তের সংখ্যা বাড়লেও মৃত্যু কমেছে। ২০২৪ সালে মারা গেছেন ৩২৬ জন, ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা নেমে এসেছে ২৫৪-তে। আক্রান্ত বৃদ্ধির পেছনে পরীক্ষার হার বৃদ্ধিকেই প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের মেডিকেল টেকনোলজিস্ট মো. আমানতুল্লাহ বলেন, ‘আগে অনেকে আক্রান্ত হলেও আসতেন না। এখন আসছেন, ফলে রোগী বাড়ছে। ডায়াগনোসিসের হার যত বাড়বে, রোগীও তত বাড়বে।’
গত দুই বছর কিট সংকটে রোগ নির্ণয় বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ২০২৪ সালের জুনে অপারেশন প্ল্যান (ওপি) বন্ধ হওয়ার পর এ সংকট দেখা দেয়। চলতি বছর এক লাখ ১০ হাজার ডিটারমাইন কিট কেনা হলেও ইউনিগোল্ড ও ফার্স্ট রেসপন্স কিট পর্যাপ্ত পরিমাণে সংগ্রহ করা হয়নি। প্রায় ছয় মাস এই কিটের সংকট থাকায় প্রথম পরীক্ষার পর বাকি দুটি পরীক্ষা করাতে না পেরে অনেক সন্দেহভাজন রোগী কেন্দ্রে যাওয়া বন্ধ করে দেন।
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে ২০২৪ সালে দুই হাজার ৪৮৬টি পরীক্ষায় ১৮৪ জনের এইচআইভি শনাক্ত হয়। কিট সংকটে ২০২৫ সালে পরীক্ষার সংখ্যা কমে দুই হাজার ৯২টিতে নেমে আসে। অথচ শনাক্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২৭২-এ, যা আগের বছরের চেয়ে ৮৮ জন বেশি।
বাংলাদেশে এইচআইভির ইতিহাস নতুন নয়। রোগী শনাক্তের আগেই ১৯৮৫ সালে এইডস প্রতিরোধে জাতীয় কমিটি গঠন করা হয়। প্রথম রোগী শনাক্ত হয় ১৯৮৯ সালে। বেসরকারি সংস্থা কাজ শুরু করে ২০১০ সালে, সরকারি কর্মসূচি শুরু হয় ২০১৬ সালে।
বেতন নেই ২২ মাস
বর্তমানে দেশের ২৩ জেলায় সরকারি এইডস প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি চালু রয়েছে। জেলাগুলো হলো ঢাকা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, দিনাজপুর, রংপুর, যশোর, পাবনা, নারায়ণগঞ্জ, চাঁদপুর, কুমিল্লা, খুলনা, সিরাজগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার, মুন্সীগঞ্জ, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, গাজীপুর, বগুড়া, বরিশাল, পটুয়াখালী, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা। এ ছাড়া সেভ দ্য চিলড্রেন এবং আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি) পৃথকভাবে শনাক্ত ও কাউন্সেলিং করছে। বাকি জেলাগুলোতে ভ্রাম্যমাণ কেন্দ্রে ডায়াগনোসিস চলে, যদিও এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন আছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
এই কর্মসূচিতে ডিভিশনাল কো-অর্ডিনেটর, মনিটরিং কো-অর্ডিনেটর, এইচআইভি কাউন্সেলিং কো-অর্ডিনেটর, কাউন্সেলর কাম অ্যাডমিনিস্ট্রেটরসহ মোট ৫৮টি পদ রয়েছে। মাঠ পর্যায়ে কর্মসূচি এই পদগুলো থেকেই পরিচালিত হয়। ২০২৪ সালে অপারেশন প্ল্যান বন্ধ হলে এসব কর্মীর বেতন বন্ধ হয়ে যায়। বিকল্প হিসেবে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরি হলেও এখনও অনুমোদন না পাওয়ায় ২২ মাস ধরে বেতন পাচ্ছেন না মাঠকর্মীরা। সর্বশেষ বেতন পেয়েছিলেন ২০২৪ সালের জুনে।
বিএমইউ কেন্দ্রের পরামর্শক ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা সাবরিনা আক্তার বলেন, ‘মাসের পর মাস বিনা বেতনে চাকরি করছি। হয়তো স্বামী চাকরি করে বলে চলতে পারছি। কিন্তু অন্যরা তো পারছে না। একদিকে বেতন নেই, অন্যদিকে চাকরি রাজস্বভুক্ত করা হবে কি না তা নিয়ে চিন্তায় আছি। এমন মানসিক অবস্থা নিয়ে সেবা দিতে হচ্ছে।’
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের মো. লিটন খান বলেন, ‘প্রতিনিয়ত রোগী বাড়ছে। কিন্তু সেভাবে জনবল নেই। জনবল বাড়লে পরীক্ষার হার আরও অনেক বাড়ত। আবার যারা আছি, গত ২২ মাস ধরে বেতন পাচ্ছি না। ডিপিপি হলে রাজস্বভুক্ত করবে, এমন আশা থেকেই এখন পর্যন্ত বেতন ছাড়া চাকরি করছি।’ তিনি বলেন, ‘আমার মতো ২৩ জন কাউন্সেলর আছে। এ ছাড়াও ২৩টি সেন্টারে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট রয়েছেন। আমাদের যদি চতুর্থ সেক্টর প্রোগ্রাম শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বলত, আপনারা চলে যান, তাহলে আর আজ এমন অবস্থা নিয়ে কাজ করতে হতো না। এর আগে এক সেক্টর প্রোগ্রামের লোকদের আরেক সেক্টর প্রোগ্রামে রাজস্বভুক্ত করা হতো। কিন্তু আমাদের বেলায় আটকে গেছে। আশা করি, সরকার আমাদের দক্ষতা ও ত্যাগের মূল্যায়ন করবে।’
এই মাঠকর্মীদের রাজস্বভুক্ত করার উদ্যোগ অবশ্য নতুন নয়। ২০২৩ সালে টিবি-লেপ্রোসি অ্যান্ড এইডস/এসটিডি প্রোগ্রাম শীর্ষক অপারেশন প্ল্যানে কর্মরত ৩৯৬টি পদসহ জনবল রাজস্ব খাতে স্থানান্তরের সুপারিশ করেছিলেন তৎকালীন লাইন ডিরেক্টর। এরপর দফায় দফায় মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের মধ্যে চিঠি চালাচালি হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও আশ্বস্ত করা হয়েছিল, শিগগিরই রাজস্বভুক্ত করা হবে।
কমছে বিদেশি বরাদ্দ
চলতি অর্থবছরে এ খাতে সরকারের বরাদ্দ ছিল ১০০ কোটি টাকার বেশি। গ্লোবাল ফান্ডের বরাদ্দ ছিল প্রায় ২৮ মিলিয়ন ডলার। কিন্তু আগামী তিন বছরের জন্য গ্লোবাল ফান্ড ঘোষণা করেছে মাত্র ১৮ মিলিয়ন ডলার। একই সঙ্গে সংস্থাটি সতর্ক করে দিয়েছে, ২০৩২ সালের পর থেকে স্থায়ীভাবে বরাদ্দ বন্ধ করে দেওয়া হবে। নতুন শর্ত হিসেবে বলা হয়েছে, যাদের মাধ্যমে এইচআইভি বেশি ছড়াচ্ছে, তাদের দিকে অধিক মনোযোগ দিয়ে কর্মসূচি নিতে হবে।
এইচআইভি প্রতিরোধ কার্যক্রমে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা রয়েছে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইরোলজি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সাইফুল্লাহ মুন্সীর। তিনি বলেন, ‘সরকার আস্তে আস্তে এইচআইভি কর্মসূচি গুটিয়ে আনছে। এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। গ্লোবাল ফান্ড ক্রমেই অর্থ তুলে নিচ্ছে, ট্রাম্পের মতো আরেকজন এলে ২০৩২ সালের আগেই এটি বন্ধ হয়ে যাবে। ফলে সরকার কতটা প্রস্তুত তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দিহান। মনে হচ্ছে না সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে। সে রকম কোনো কর্মসূচি তাদের নেই।’
যা বলছে কর্তৃপক্ষ
জাতীয় এইডস নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির পরিচালক ডা. মো. খায়রুজ্জামান বলেন, ‘সমকামীদের সংখ্যা বাড়ার বিষয়টি দুইভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। একটি হলো সমকামী বাড়ছে, আবার সমকামী আগেই ছিল, এখন ডায়াগনোসিস হওয়ার কারণে বেশি পাওয়া যাচ্ছে। এটি উদ্বেগজনক যে, আক্রান্তদের বড় অংশই শিক্ষার্থী। গত দুই-তিন বছর ধরে এটি ক্রমাগত বাড়ছে।’
আক্রান্ত বাড়ার কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘আক্রান্তদের মধ্যে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, মেডিকেল ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা রয়েছেন। সমকামিতা আগেও ছিল, কিন্তু হয়তো প্রকাশ পেত না। এখন শিক্ষার্থীদের মধ্যেও প্রকাশ পাচ্ছে। এ ছাড়া যারা বড় তাদের মধ্যেও রয়েছে, কিন্তু তারাও গোপন করছে। সমাজ আগে বাধা দিত, এখন প্রকাশ করতে পারায় ডায়াগনোসিস হচ্ছে। শনাক্ত হওয়ার ফলে আক্রান্তদের চিকিৎসার আওতায় আনা সম্ভব হচ্ছে। তবে শিক্ষার্থী ও শিক্ষিতদের মধ্যে কেন বাড়ছে, সেটি গবেষণার বিষয়।’
জনবল সংকট ও বেতন বন্ধের বিষয়ে ডা. খায়রুজ্জামান বলেন, ‘ওপি শেষ হয়েছে মানে তার চাকরি শেষ। তবে তারা যেহেতু কাজ করছে, সরকার নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ভূতাপেক্ষভাবে তাদের বেতনের বিষয়ে ডিপিপি অনুমোদন দিয়েছে। তারপর চাকরি থাকবে কি থাকবে না, তা নির্ভর করছে মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের ওপর। তবে আমরা তাদের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় রাজস্বভুক্ত করার সুপারিশ করেছি। বাকিটা মন্ত্রণালয় দেখবে।’
আন্তর্জাতিক বরাদ্দ কমে আসার প্রেক্ষাপটে প্রস্তুতি নিয়ে তিনি বলেন, ‘ইতোমধ্যে সরকার বিষয়টি আমলে নিয়েছে। বর্তমানে যে বরাদ্দ আছে, সেটিও কোনো অংশে কম নয়। ১০০ কোটি টাকার পাশাপাশি নিজস্ব জনবল ও ভবন সবকিছুই থাকছে। ২০৩২ সাল পর্যন্ত নিজেদের প্রস্তুত করতে কাজ চলছে।’
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের মাঝে কেন বাড়ছে, বিষয়টির গবেষণা দরকার। এইচআইভি নিয়ে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বড় আকারে কর্মসূচি ঠিক করছে।’
বেতন বন্ধের কারণে ডায়াগনোসিস ব্যাহত হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘এইডস কর্মসূচিসহ ওপির অধীনে চলা অন্যান্য কার্যক্রমের জনবলকে রাজস্ব খাতে আনা হবে নাকি তাদেরকে অন্য খাতে একই ক্যাটাগরিতে দেওয়া হবে, তা নিয়ে একটি কমিটি করে দেওয়া হয়েছে। তারা কাজ করছে।’
আগামী অর্থবছর থেকে ডিপিপির আওতায় সব জেলায় প্রতিরোধ ও চিকিৎসা কর্মসূচি বিস্তারের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী বলেন, ‘বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ছিল স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির পাঁচ শতাংশ ব্যয় করা। তার আলোকে এ খাতে বর্তমান বরাদ্দের দুই থেকে তিনগুণ পর্যন্ত বেশি অর্থ বাড়বে। ফলে এইডস নির্মূল কর্মসূচিতেও বাড়বে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি সমঝোতা চুক্তি হয়েছে। নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধে একসঙ্গে কাজ করব আমরা।’
সচেতনতা ও নজরদারির তাগিদ
অধ্যাপক ডা. সাইফুল্লাহ মুন্সী বলেন, ‘সমকামিতা মূলত একটি অভ্যাসগত ও মানসিক অবস্থা থেকে হয়ে থাকে। প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে এটি হয়ে আসছে। আগেও এই শ্রেণির মানুষ ছিল, কিন্তু সামাজিকমাধ্যমের মতো এত সহজ নেটওয়ার্কিং ব্যবস্থা না থাকায় তারা গোপনে থাকত। এখন নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রাখছে, সামনে আসছে।’
করণীয় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এটি থেকে বাঁচার একমাত্র পথ সচেতনতা সৃষ্টি করা। এগুলো যে নৈতিকতার বিপরীত, শারীরিকভাবেও নানা রোগের জন্ম দেয়; এই ক্ষতিকর দিকগুলো সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়গুলো কীভাবে ছড়াচ্ছে, তা নজরদারি করতে হবে। আইনের প্রয়োগ দরকার। তবে অবশ্যই এক্ষেত্রে সংবেদনশীলতা জরুরি।’
সমাজের দুই মেরুর প্রতিক্রিয়া নিয়েও সতর্ক করেন অধ্যাপক মুন্সী। তিনি বলেন, ‘সমকামিতা সম্পর্কে আমাদের সমাজে নেতিবাচক ধারণা অনেক বেশি। একপক্ষ সরাসরি পক্ষে দাঁড়ায়, অন্যপক্ষ বিপক্ষে। ফলে সরকারকে সমতা রেখেই চিন্তা করতে হবে। সমকামী হলেই তাকে ফাঁসি দিয়ে দিতে হবে, আবার সমকামিতার জন্য রাস্তায় নামতে হবে—দুটোর কোনোটি হওয়া উচিত নয়। এতে করে যারা এতে জড়িত, তাদের কাজ বন্ধ না হলেও চিকিৎসা ও ফিরে আসার পথ বন্ধ হয়ে যাবে। তখন নীরবে এইডস ছড়াবে।’