আসন্ন ঈদুল আজহা সামনে রেখে রাজধানীসহ সারাদেশের কামারপল্লিগুলোতে বেড়েছে কর্মব্যস্ততা। কোরবানির পশু জবাই ও মাংস কাটার জন্য প্রয়োজনীয় ছুরি, চাপাতি, বটি ও কুড়ালের চাহিদা বাড়ায় দিন-রাত কাজ করছেন কামাররা। রাজধানীর কদমতলী ও যাত্রাবাড়ী এলাকার বিভিন্ন কামারের দোকানে গিয়ে দেখা গেছে এমন চিত্র।
কদমতলী থানার শনিরআখড়ার পলাশপুর এলাকায় রাস্তার পাশজুড়ে রয়েছে কয়েকটি কামারের দোকান। প্রতিটি দোকানেই চলছে লোহা গলানো, আগুনে তাপ দেওয়া এবং হাতুড়ির আঘাতে ছুরি-বটি তৈরির ব্যস্ততা। কোথাও পুরোনো সরঞ্জাম ধার দেওয়া হচ্ছে, কোথাও নতুন অর্ডারের কাজ চলছে।
স্থানীয় কামার সুজন কর্মকার প্রায় ২৫ বছর ধরে এই পেশার সঙ্গে জড়িত। বাবা-দাদার পেশা ধরে রাখলেও ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী নন তিনি।
তিনি বলেন, “আগে এই ব্যবসা অনেক ভালো ছিল। এখন কারখানায় তৈরি পণ্য, বিদেশি বিশেষ করে চীনের পণ্য এবং অনলাইনে বিক্রির কারণে আমাদের কাজ অনেক কমে গেছে। সারা বছর তেমন আয় হয় না, শুধু কোরবানির ঈদ এলেই কিছুটা ব্যস্ততা বাড়ে।”
দোকানে দেখা যায়, একজন ভাট্টিতে বাতাস দিচ্ছেন, আরেকজন আগুনে লাল হওয়া লোহা হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে তৈরি করছেন ছুরি ও চাপাতি। প্রচণ্ড গরম আর আগুনের তাপে কাজ করলেও মুখে ক্লান্তির চেয়ে বেশি ছিল টিকে থাকার সংগ্রামের ছাপ।
সুজন আরও বলেন, “কয়লা, লোহা ও ইস্পাতের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচও বেড়েছে। কিন্তু সেই অনুযায়ী লাভ বাড়েনি। তাই আমি চাই না আমার ছেলে-মেয়েরা এই পেশায় আসুক।”
ঈদকে কেন্দ্র করে ক্রেতাদের ভিড়ও বেড়েছে এসব দোকানে। কেউ নতুন সরঞ্জাম কিনছেন, কেউ পুরোনো ছুরি-বটি ধার করাতে আসছেন।
দনিয়া সরাইল এলাকা থেকে কেনাকাটা করতে আসা সবুজ বলেন, “প্রতি বছর কোরবানির ঈদের আগে এখান থেকেই চাপাতি ও ছুরি কিনি। এবারও কিনলাম, তবে আগের চেয়ে দাম কিছুটা বেশি।”
অন্যদিকে যাত্রাবাড়ীর কুতুবখালী থেকে আসা মিরাজ জানান, “পুরোনো সরঞ্জাম ঝালিয়ে নিতে প্রতি বছরই এখানে আসি। কামারদের তৈরি জিনিসের ধার ও মান এখনো ভালো।”
বাজার ঘুরে দেখা গেছে, আকারভেদে চাপাতি বিক্রি হচ্ছে ৯০০ থেকে ১২০০ টাকায়, ছুরি ২৫০ থেকে ৬০০ টাকায়, বটি ৫০০ থেকে ১২৫০ টাকায় এবং কুড়াল ৭০০ থেকে ১০০০ টাকায়।
কামারদের ভাষ্য, আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হলেও কোরবানির ঈদ তাদের জন্য এখনো আশীর্বাদ হয়ে আসে। বছরের এই সময়টিতেই বাড়তি কাজ ও আয় হয়। তবে নতুন প্রজন্মের আগ্রহ কমে যাওয়ায় ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে বসেছে শত বছরের ঐতিহ্যবাহী এই পেশা।