নতুন একটি স্মার্টফোন কেনার পরিকল্পনা থাকলে সিদ্ধান্ত নিতে হবে আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই। কারণ, আগামী ১ জুলাই থেকে আমদানি করা অফিসিয়াল স্মার্টফোন কিনতে আগের তুলনায় কয়েক হাজার টাকা বেশি গুনতে হতে পারে। সরকারের দেওয়া সাময়িক শুল্ক-সুবিধার মেয়াদ ৩০ জুন শেষ হচ্ছে। নতুন অর্থবছরের বাজেটে এই সুবিধা আর বহাল রাখা হয়নি। ফলে আমদানি পর্যায়ে করের চাপ আবারও বেড়ে যাবে— যার সরাসরি প্রভাব পড়বে খুচরা বাজারে। আর শেষ পর্যন্ত বাড়তি ব্যয়ের পুরো বোঝা গিয়ে পড়বে সাধারণ গ্রাহকের ঘাড়েই।
খাত-সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, শুল্ক-সুবিধা প্রত্যাহারের ফলে আমদানিকৃত স্মার্টফোনের দাম ২০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। এতে বিশেষ করে অ্যাপল, স্যামসাং, গুগল, হুয়াওয়ে, মটোরোলা ও শাওমির মতো ব্র্যান্ডের প্রিমিয়াম মডেলগুলো আরও বেশি ব্যয়বহুল হয়ে উঠবে। কারণ এসব ফোন এখনও পুরোপুরি আমদানিনির্ভর।
করভার আবার ৬৪ শতাংশের বেশি
অবৈধ বা ‘গ্রে-মার্কেট’ থেকে আসা হ্যান্ডসেটের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় বৈধ আমদানিকারকদের টিকিয়ে রাখতে চলতি বছরের জানুয়ারিতে সরকার সম্পূর্ণ তৈরি স্মার্টফোন আমদানির ওপর কাস্টমস শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করেছিল। এই সাময়িক সুবিধার কারণে আমদানিকৃত ফোনের কার্যকর করহার ৬৪ শতাংশের বেশি থেকে কমে ৪৩ দশমিক ৪৩ শতাংশে নেমে আসে।
তবে এই সুবিধার মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী ৩০ জুন। নতুন অর্থবছরের বাজেটে এ সুবিধা বহাল রাখার কোনও ঘোষণা না থাকায় ১ জুলাই থেকে কার্যকর করহার আবার বেড়ে প্রায় ৬৪ দশমিক ২৫ শতাংশে পৌঁছাবে। ফলে আমদানিকারকদের ব্যয় বাড়বে এবং সেই অতিরিক্ত ব্যয় শেষ পর্যন্ত খুচরা বাজারে ক্রেতাদেরই বহন করতে হবে।
সবচেয়ে বড় চাপ পড়বে গ্রাহকের ওপর
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, আমদানি পর্যায়ে কর বাড়লে ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন সেই অতিরিক্ত ব্যয় নিজেদের ওপর বহন করেন না। শেষ পর্যন্ত তা পণ্যের বিক্রয়মূল্যের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়। ফলে একই ফোন কিনতে একজন গ্রাহককে কয়েক হাজার টাকা পর্যন্ত বেশি খরচ করতে হতে পারে।
অর্থাৎ সরকার রাজস্ব বাড়ালেও সেই অর্থ সরাসরি সরকারের কাছে দেবে না ব্যবসায়ীরা— বরং দাম বাড়িয়ে সেই অর্থ আদায় করা হবে সাধারণ ভোক্তার কাছ থেকেই। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন মধ্যবিত্ত ও তরুণ ক্রেতারা, যারা শিক্ষা, চাকরি, ফ্রিল্যান্সিং কিংবা অনলাইন ব্যবসার জন্য স্মার্টফোনের ওপর নির্ভরশীল।
উদ্বেগে আমদানিকারকরা
মোবাইল ফোন ইন্ডাস্ট্রি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এমআইওবি) এক নেতা বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে মেমোরি চিপ, প্রসেসর, মাদারবোর্ড ও ব্যাটারিসহ বিভিন্ন যন্ত্রাংশের দাম আগেই বেড়েছে। এর ফলে উৎপাদন ব্যয়ও বাড়ছে। এর সঙ্গে আবার আমদানি শুল্ক বাড়লে স্মার্টফোনের দাম বৃদ্ধি অনিবার্য হয়ে পড়বে। এতে অনেক ক্রেতা আবারও কম দামের গ্রে-মার্কেটের ফোনের দিকে ঝুঁকতে পারেন।
কেন বাড়ানো হলো না শুল্ক-সুবিধার মেয়াদ
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্র জানায়, বৈধ আমদানি বাড়ানো এবং স্থানীয় সংযোজন শিল্পকে উৎসাহ দিতে ছয় মাসের জন্য এই শুল্ক-সুবিধা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সরকারের প্রত্যাশা অনুযায়ী বৈধ আমদানি বা স্থানীয় উৎপাদন— কোনোটিই উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়েনি। তাই সাময়িক এই সুবিধা আর নবায়ন না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
প্রিমিয়াম ফোনের দাম বাড়বে সবচেয়ে বেশি
বর্তমানে দেশে নিম্ন ও মধ্যম দামের অনেক স্মার্টফোন স্থানীয়ভাবে সংযোজন করা হলেও অ্যাপল, গুগল, হুয়াওয়ে, মটোরোলা, স্যামসাং ও শাওমির অধিকাংশ প্রিমিয়াম মডেল বিদেশ থেকেই আমদানি করতে হয়। ফলে এসব ফোনের ওপর কর বৃদ্ধি সরাসরি বিক্রয়মূল্যে প্রতিফলিত হবে।
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, কয়েক লাখ টাকা দামের ফ্ল্যাগশিপ ফোনের ক্ষেত্রে দাম কয়েক হাজার থেকে কয়েক দশ হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়তে পারে।
গ্রে-মার্কেট আরও শক্তিশালী হওয়ার আশঙ্কা
সরকারের উদ্দেশ্য ছিল বৈধ ও অবৈধ ফোনের দামের ব্যবধান কমিয়ে অফিসিয়াল বাজারকে শক্তিশালী করা। একইসঙ্গে বিটিআরসি ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (এনইআইআর) চালুর মাধ্যমে গ্রে-মার্কেট নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেয়।
কিন্তু বাস্তবে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় এখনও অনানুষ্ঠানিকভাবে আনা ফোন সহজেই বিক্রি হচ্ছে। ফলে বৈধ ফোনের দাম আবার বাড়লে ক্রেতাদের একটি বড় অংশ কম দামের আনঅফিশিয়াল বাজারের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্মার্টফোন এখন আর বিলাসপণ্য নয়
তথ্যপ্রযুক্তিবিদরা বলছেন, স্মার্টফোন এখন আর বিলাসপণ্য নয়। শিক্ষা, কর্মসংস্থান, ফ্রিল্যান্সিং, মোবাইল ব্যাংকিং, ডিজিটাল আর্থিক সেবা, ই-কমার্সসহ প্রায় সব ধরনের ডিজিটাল কার্যক্রমের প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে স্মার্টফোন। তাই এর ওপর অতিরিক্ত করের চাপ কমানো উচিত। কারণ, স্মার্টফোনের দাম বাড়লে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন সাধারণ মানুষ।
রাজস্ব বাড়লেও দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতির আশঙ্কা
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, উচ্চ করহার স্বল্পমেয়াদে সরকারের রাজস্ব বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে বৈধ আমদানি কমে গেলে সরকার প্রত্যাশিত রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হতে পারে। একইসঙ্গে গ্রে-মার্কেট আরও বিস্তৃত হবে এবং ডিজিটাল অর্থনীতি সম্প্রসারণের লক্ষ্যও বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
সব মিলিয়ে ১ জুলাই থেকে শুল্ক-সুবিধা প্রত্যাহারের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে সাধারণ ক্রেতাদের ওপর। আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীরা বাড়তি করের চাপ পণ্যের দামের সঙ্গে সমন্বয় করলেও শেষ পর্যন্ত সেই অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ করতে হবে গ্রাহকদেরই। ফলে স্মার্টফোন কেনা আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠবে, যা দেশের ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তির পথেও নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।