মানবসমাজে শান্তি, শৃঙ্খলা এবং পারস্পরিক সৌহার্দ্য বজায় রাখার মূল ভিত্তি হলো একে অপরের অধিকার রক্ষা করা এবং প্রাপ্য অধিকার যথাসময়ে বুঝিয়ে দেওয়া। ইসলামে মানুষের অধিকার বা ‘হক্বুল ইবাদ’ (বান্দার হক)-এর ওপর এতটা গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে যে, স্বয়ং আল্লাহ তাআলা তাঁর নিজের হক (হক্বুল্লাহ) ক্ষমা করলেও মানুষের হক সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ক্ষমা ছাড়া ক্ষমা করেন না।
কারো পাওনা টাকা, জমি-জমা, সামাজিক সম্মান বা যেকোনো ন্যায্য অধিকার স্বেচ্ছায় ও সসম্মানে ফিরিয়ে দেওয়ার মধ্যে ইহকালীন ও পরকালীন বহু বড় ফজিলত এবং বরকত রয়েছে। পবিত্র কোরআন ও হাদিসের আলোকে এর প্রধান ফজিলতগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:
“নিশ্চয়ই আল্লাহ আমানতসমূহ তার হকদারদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিচ্ছেন।” (সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৫৮)
অন্য আয়াতে সফল মুমিনদের গুণাবলী বর্ণনা করতে গিয়ে আল্লাহ বলেন:
“আর যারা নিজেদের আমানত ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে…” (সূরা আল-মুমিনুন, আয়াত: ৮)
২. কেয়ামতের দিন নিশ্চিত ধ্বংস ও দেউলিয়াত্ব থেকে মুক্তি
দুনিয়াতে মানুষের প্রাপ্য অধিকার ফিরিয়ে না দিলে পরকালে তার চরম মূল্য দিতে হবে। সেদিন টাকা-পয়সা দিয়ে পার পাওয়া যাবে না; বরং নিজের নেক আমল দিয়ে পাওনাদারের দাবি মেটাতে হবে।
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ সাহাবিদের জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমরা কি জানো দেউলিয়া কে?’ সাহাবিরা বললেন, ‘যার টাকা-পয়সা ও ধন-সম্পদ নেই, সে-ই তো দেউলিয়া।’ রাসুল ﷺ বললেন:
“আমার উম্মতের মধ্যে সে-ই প্রকৃত দেউলিয়া, যে কিয়ামতের দিন নামাজ, রোজা ও জাকাত নিয়ে উপস্থিত হবে; কিন্তু সে দুনিয়াতে কাউকে গালি দিয়েছিল, কারো ওপর অপবাদ দিয়েছিল, কারো সম্পদ আত্মসাৎ করেছিল, কাউকে হত্যা করেছিল বা কাউকে আঘাত করেছিল। ফলে (বিচারালয়ে) তার নেক আমল থেকে এদেরকে (পাওনাদারদের) হক বুঝিয়ে দেওয়া হবে। এভাবে দাবিদারদের হক পূরণ করার আগেই যদি তার নেক আমল শেষ হয়ে যায়, তবে পাওনাদারদের গুনাহসমূহ এনে তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে এবং তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।” (সহীহ মুসলিম, হাদিস নং- ২৫৮১)
অতএব, দুনিয়াতেই মানুষের প্রাপ্য বুঝিয়ে দিলে পরকালের এই ভয়াবহ দেউলিয়াত্ব থেকে বাঁচা যাবে।
৩. পরকালে পূর্ণ ইনসাফ ও আরশের নিচে ছায়া লাভ
যারা কোনো প্রকার টালবাহানা না করে মানুষের পাওনা বা অধিকার দ্রুত পরিশোধ করে দেয়, কিয়ামতের কঠিন বিপদের দিনে আল্লাহ তাআলা তাদের পুরস্কৃত করবেন।
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“কিয়ামতের দিন অবশ্যই পাওনাদারদের তাদের প্রাপ্য অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া হবে। এমনকি শিং বিশিষ্ট ছাগল যদি শিংবিহীন ছাগলকে গুঁতো দিয়ে থাকে, তবে তারও প্রতিশোধ (ইনসাফ) নেওয়া হবে।” (সহীহ মুসলিম)
অন্যদিকে, কেউ যদি কোনো অভাবী পাওনাদারকে তার প্রাপ্য বুঝিয়ে দেয় বা ঋণ পরিশোধে ছাড় দেয়, তবে রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, আল্লাহ তাআলা তাকে কিয়ামতের দিন আরশের ছায়াতলে আশ্রয় দেবেন।
৪. রিজিক ও জীবনে বরকত বৃদ্ধি
অনেকে মনে করেন মানুষের অধিকার বা পাওনা টাকা বুঝিয়ে দিলে নিজের সম্পদ কমে যাবে। কিন্তু ইসলামের বিধান সম্পূর্ণ উল্টো। সৎ নিয়তে মানুষের পাওনা পরিশোধ করলে আল্লাহ তাআলা সম্পদে অলৌকিক বরকত দান করেন।
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
প্রাপ্য অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার বাস্তব রূপরেখা:
- আর্থিক পাওনা: কারো কাছ থেকে ধার নিলে, কারো জমিতে বা ব্যবসায় খাটলে, শ্রমিকের মজুরি বা কর্মচারীর বেতন চুক্তি অনুযায়ী সময়মতো এবং পূর্ণভাবে বুঝিয়ে দেওয়া।
- পারিবারিক অধিকার: পিতা-মাতা, স্ত্রী, সন্তান এবং নিকটাত্মীয়দের যে শরয়ী ও মানসিক অধিকার রয়েছে, তা যথাযথভাবে আদায় করা। বিশেষ করে বোন বা কন্যাদের মিরাসের (উত্তরাধিকার) সম্পত্তি বুঝিয়ে দেওয়া।
- সামাজিক ও নৈতিক অধিকার: কারো গীবত বা পরনিন্দা করে থাকলে তার কাছে ক্ষমা চেয়ে নেওয়া, কারো সম্মানহানি করে থাকলে তা পুনরুদ্ধার করা।
প্রাপ্য অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া কেবল একটি সামাজিক ভদ্রতা নয়, এটি ইসলামের অন্যতম ফরজ ইবাদত। সমাজ থেকে জুলুম ও হাহাকার দূর করতে এবং নিজের আখেরাতকে নিরাপদ করতে আমাদের প্রত্যেকের উচিত আমাদের কাছে গচ্ছিত মানুষের ছোট-বড় সব অধিকার দ্রুত ফিরিয়ে দেওয়া। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে মানুষের হক আদায় করার তৌফিক দান করুন। আমীন।