দেশজুড়ে তীব্র তাপদাহের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে লোডশেডিং, জনজীবনে চরম ভোগান্তি সৃষ্টি করেছে। একদিকে অসহনীয় গরম, অন্যদিকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় মানুষ হয়ে উঠছে অতিষ্ঠ। শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। কোথাও কোথাও দিনে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না, ফলে দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে মারাত্মকভাবে।
বিশেষ করে এবারের এসএসসি পরীক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে। দিনের পাশাপাশি রাতেও বিদ্যুৎ বিভ্রাট চলমান থাকায় তাদের পড়াশোনার পরিবেশ ভেঙে পড়েছে। অন্ধকার ও গরমের মধ্যে কঠিন হয়ে পড়ছে পড়ালেখা। অনেক শিক্ষার্থী পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নিতে না পেরে মানসিক চাপেও ভুগছে।
আবহাওয়ার পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। দিনে সর্বোচ্চ তাপমাত্রার সঙ্গে সঙ্গে রাতের তাপমাত্রাও বেড়ে চলেছে, ফলে কোথাও স্বস্তি মিলছে না। বাতাসে জলীয়বাষ্প বেশি থাকায় গরমের তীব্রতা আরও বেড়ে যাচ্ছে। অতিরিক্ত ঘামের কারণে মানুষ দ্রুত ক্লান্ত ও দুর্বল হয়ে পড়ছে। শ্রমজীবী মানুষের জন্য এই পরিস্থিতি সবচেয়ে কঠিন। যারা দিনে এনে দিনে খায়, তাদের আয়-রোজগারে বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে।
বিদ্যুৎ খাতে সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। চাহিদার তুলনায় অন্তত ২ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কম উৎপাদন হচ্ছে বলে জানা গেছে। এর ফলে লোডশেডিং বাড়ছে। শহরে কিছুটা সহনীয় হলেও গ্রামে এর প্রভাব মারাত্মক। কৃষি, শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিক্ষা—সব ক্ষেত্রেই এর নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত দেশে গরম যেমন বাড়ে, তেমনি বিদ্যুতের চাহিদাও বৃদ্ধি পায়। তবে এবার জ্বালানি সংকট, যান্ত্রিক ত্রুটি এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রের রক্ষণাবেক্ষণজনিত সমস্যার কারণে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। তাপমাত্রা কমা না পর্যন্ত পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতির সম্ভাবনা কম বলেই মনে করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, কয়লার সরবরাহ বাড়ানো এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ শেষ করে দ্রুত পূর্ণ উৎপাদনে ফেরার চেষ্টা চলছে। তবে এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে কিছুটা সময় লাগতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে মানুষ বিকল্প বিদ্যুৎ ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকছে। বিশেষ করে আইপিএস (IPS) ও সোলার সিস্টেমের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। বাসাবাড়ি, অফিস এবং দোকানপাটে এসব প্রযুক্তির ব্যবহার এখন অনেকটাই সাধারণ হয়ে উঠেছে। বিদ্যুৎ না থাকলেও আইপিএসের মাধ্যমে কিছু সময়ের জন্য আলো, ফ্যান এবং প্রয়োজনীয় ডিভাইস চালানো সম্ভব হচ্ছে, যা অনেকের জন্য স্বস্তি এনে দিচ্ছে।
গ্রামাঞ্চলেও এই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বিদ্যুতের ঘাটতি ও দীর্ঘ সময়ের লোডশেডিং মানুষকে সৌরবিদ্যুতের দিকে আগ্রহী করে তুলেছে। বাড়ির ছাদ বা খোলা জায়গায় সোলার প্যানেল বসিয়ে প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে। এটি পরিবেশবান্ধব হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদে একটি কার্যকর সমাধান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তবে বিকল্প বিদ্যুৎ ব্যবস্থার একটি বড় বাধা হচ্ছে প্রাথমিক খরচ। আইপিএস বা সোলার সিস্টেম স্থাপনে তুলনামূলক বেশি অর্থ প্রয়োজন হয়, যা নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সহজ নয়। ফলে অনেকেই চাইলেও এসব সুবিধা গ্রহণ করতে পারছেন না।
রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে এসব পণ্যের চাহিদা বেড়ে যাওয়ার স্পষ্ট চিত্র দেখা যাচ্ছে। বায়তুল মোকাররম, নবাবপুর ও মালিবাগের ইলেকট্রনিক্স দোকানগুলোতে ক্রেতাদের ভিড় লক্ষণীয়। চার্জার ফ্যান, রিচার্জেবল লাইট, আইপিএস এবং সোলার সিস্টেম কিনতে মানুষ ভিড় করছেন।
রাজধানী ঢাকার কাপ্তান বাজার কমপ্লেক্সের ব্যবসায়ী আব্দুল মালেক জানান, তীব্র গরম ও ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে বাজারে আইপিএস (IPS) ও সোলার সিস্টেমের চাহিদা হঠাৎ করে বেড়ে গেছে। আগে যেখানে সীমিত পরিসরে এসব পণ্যের বিক্রি হতো, এখন প্রায় প্রতিদিনই ক্রেতাদের ভিড় বাড়ছে।
এই হঠাৎ চাহিদা বৃদ্ধির ফলে বাজারে বিভিন্ন ধরনের ব্যাটারির সংকট দেখা দিয়েছে। সরবরাহকারীরা চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে পর্যাপ্ত পণ্য সরবরাহ করতে পারছেন না। ফলে অনেক ক্রেতাকে অপেক্ষা করতে হচ্ছে বা বেশি দামে পণ্য কিনতে হচ্ছে।
ব্যবসায়ী মনে করছেন, লোডশেডিং পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে এই চাহিদা আরও বাড়তে পারে, যা বাজারে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে।
রাজধানী ঢাকার সুন্দরবন স্কয়ার সুপার মার্কেটের ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন বলেন, তীব্র গরম ও লোডশেডিংয়ের কারণে বাজারে আইপিএস (IPS), সোলার সিস্টেম এবং চার্জার ফ্যানের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে। আগে সীমিত আকারে এসব পণ্যের বিক্রি হলেও বর্তমানে প্রতিদিনই ক্রেতার চাপ বাড়ছে। অনেকেই বিদ্যুতের অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় বিকল্প ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকছেন।
তবে হঠাৎ চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় বাজারে এসব পণ্যের সংকট দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে ব্যাটারি ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশের সরবরাহ কমে গেছে। ডলার সংকট এবং এলসি (লেটার অব ক্রেডিট) খোলার অনুমতি না পাওয়ায় ব্যবসায়ীরা চাহিদা অনুযায়ী পণ্য আমদানি করতে পারছেন না।
ফলে বাজারে সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে। এতে ক্রেতাদের অতিরিক্ত দাম গুনতে হচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পণ্য সময়মতো পাওয়া যাচ্ছে না।
বায়তুল মোকাররম মার্কেটে মগবাজার থেকে আসা সুমন আসফার বলেন, তীব্র গরম ও ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে তাদের বাসায় ছোট্ট বাচ্চাটি খুব কষ্ট পাচ্ছে। বিদ্যুৎ চলে গেলে গরমে শিশুটি অস্থির হয়ে ওঠে, ঠিকমতো ঘুমাতে পারে না এবং বারবার অসুস্থ হয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
তিনি জানান, বাধ্য হয়েই তিনি একটি চার্জার ফ্যান কিনতে এসেছেন, যাতে বিদ্যুৎ না থাকলেও অন্তত কিছুটা স্বস্তি পাওয়া যায়। বাজারে এসে দেখছেন, একই কারণে অনেক মানুষই চার্জার ফ্যান কিনতে ভিড় করছেন।
সুমন আসফার মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে এসব বিকল্প ব্যবস্থা এখন প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে, বিশেষ করে যাদের বাসায় শিশু বা বয়স্ক মানুষ রয়েছে, তাদের জন্য এটি অনেকটা বাধ্যতামূলক হয়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিবছর মার্চ থেকে এসব পণ্যের চাহিদা বাড়লেও জুলাই-আগস্টে কমে যায়। তবে এবছর পরিস্থিতি ব্যতিক্রম, কারণ তীব্র লোডশেডিং পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
সব মিলিয়ে, তীব্র গরম ও বিদ্যুৎ সংকট দেশের জনজীবনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে বিকল্প জ্বালানির প্রসার এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধির দিকে জোর দেওয়া এখন সময়ের দাবি।